সময়ের দাবি ব্যক্ত হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যে
জহির চৌধুরী
Published : Wednesday, 22 November, 2017 at 12:00 AM
গত ১২ নবেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে জনসমাবেশ করেছে বিএনপি। এ সমাবেশ ঘিরে রাজনৈতিক এবং নাগরিক সমাজে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, কৌতূহল ছিল। সরকার বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দিবে কিনা, দিলেও নির্বিঘেœ সমাবেশ করা সম্ভব হবে কিনা, সমাবেশ হলে বিএনপি চেয়ারপারসন কি বার্তা দিবেনÑ এ নিয়েই ছিল উদ্বেগ-উৎকন্ঠা, কৌতূহল। অনুমতি না মেলায় কয়েক দফা সময় পরিবর্তনের পর শেষ পর্যন্ত ১২ নবেম্বর সমাবেশ করেছে বিএনপি। সমাবেশের দিন সকাল থেকে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গিয়েছিল রাজধানীতে চলাচলকারী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানী অভিমুখী গণপরিবহন। সমাবেশের আগে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাড়ি-ঘরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হানা দেয়ার, বহু নেতাকর্মী গ্রেফতারের, সমাবেশে আগত নেতাকর্মীদের পথে পথে বাধা দেয়ার, মারধরসহ নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে। এত কিছুর  পরও শেষ পর্যন্ত  সফলভাবেই বিএনপির  আহূত সমাবেশটি হয়েছে। আওয়ামী ঘরানার সংবাদমাধ্যমসহ দেশী-বিদেশী সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতেই নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সমাবেশে বিপুল জনসমাগম হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ আশপাশের এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য, তিলধারণের ঠাঁই ছিল না। বিকাল তিনটার কিছু পরে জনসমুদ্র ঠেলে সমাবেশের প্রধান অতিথি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সভামঞ্চে উঠেন। বিকাল চারটার দিকে প্রধান অতিথির বক্তব্য শুরু করেন বেগম খালেদা জিয়া। প্রধান অতিথির ভাষণে বেগম খালেদা জিয়া দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপির আসন্ন সংসদ নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, দলীয় সরকার অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারে না, পারবে না। শেখ হাসিনার অধীনেও নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোই তার প্রমান। খুলনায় আমাদের লোকদের নমিনেশন পেপার পর্যন্ত জমা দিতে দেয়নি। একই অবস্থা চিকিৎসক-শিক্ষকদের নির্বাচনগুলোতেও। নির্বাচন হতে হবে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। সে নির্বাচনে জনগণ যেন নির্বিঘেœ নির্দ্বিধায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, সেরকম সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহিতামূলক সংসদ চাই। ইভিএম চলবে না, ইভিএম বন্ধ করতে হবে এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। শুধু সেনাবাহিনী মোতায়েন করলে হবে না ম্যাজিস্ট্র্রেসি পাওয়ার দিতে হবে। দেশের কল্যাণ ও উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বহুদলীয় গণতন্ত্রে পথ ও মতের পার্থক্য থাকবে। কিন্তু জনগণের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের এবং রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের কথাও বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। এছাড়াও বেগম খালেদা জিয়া তাঁর  বক্তব্যে গুম, খুন, অপহরণ, বিভিন্ন ক্ষেত্রের অনিয়ম-দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এবং খাজনা-ট্যাক্স-সেবামূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধির , প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের প্রেক্ষাপটসহ দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে কি করবে তার সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়েছেন। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে জনসমাবেশের ভাষণে দেয়া বেগম খালেদা জিয়ার কথাগুলো প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী। কথাগুলো দেশের আপামর জনসাধারণেরই কথা। বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু-গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, জবাবদিহিতামূলক সংসদ, প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার, রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন এনে সুরাজনীতির ধারা প্রবর্তন, শক্তিশালী জাতীয় ঐক্য, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান, অনিয়ম-দুর্নীতি, অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য, বিদেশে অর্থপাচার বন্ধ চায় না কে? চাইবে না তারাই যারা এসবে জড়িত, মদদ দেয় অথবা সুবিধাভোগী। বাংলাদেশের শান্তি-গণতন্ত্র, আইনের শাসনে বিশ^াসী আপামর মানুষ বিএনপি চেয়ারপারসনের কথাগুলোর সাথে সহমত পোষণ না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। এ সমস্যাগুলোর মূলে জবাবদিহিতার রাজনীতির অনুপস্থিতি। : দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহিতার রাজনীতি অনুশীলিত হয়। জবাবদিহিতার রাজনীতি নিশ্চিত হয় স্বচ্ছ নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকলেই। বাংলাদেশে স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা একপ্রকার ধ্বংসই হয়ে গেছে। জাল-জালিয়াতির, বিনাভোটের, প্রহসনের নির্বাচন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাজনীতির কবর রচনা করেছে। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে  অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এরজন্য কি প্রয়োজন সে কথাগুলোই বিএনপি চেয়ারপারসন তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন। সবারই কথা, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাজনীতি কার্যকর করা জরুরি হয়ে গেছে। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ রাজনীতি চাইলে জাল-জালিয়াতি, বিনা ভোটের, প্রহসনের নির্বাচনের পক্ষে থাকার সুযোগ নেই। কারচুপির সুযোগ প্রমাণিত হওয়াতে বিভিন্ন দেশে পরিত্যাজ্য  ইভিএম-এর মাধ্যমে, দলীয়করণের প্রশাসন, দলকানা নির্বাচন কমিশনের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে নাÑএটা কি বলার অপেক্ষা রাখে। গুম, অপহরণ, লুটপাট, প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস-নৈরাজ্য, অর্থপাচার, চাঁদাবাজি, দখল-টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেট করে পণ্যমূল্যবৃদ্ধি, কর-ট্যাক্স-খাজনা,পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্য দফায় দফায় অযৌক্তিক বৃদ্ধি, বিচারহীনতার সংস্কৃতিসহ অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে মুক্তির জন্যই জবাবদিহির সরকার ও রাজনীতি প্রয়োজন। এরজন্য অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া গত্যন্তর নেই। লন্ডনের হাউস অব কমন্সে ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটি আ্যলায়েন্সের উদ্যোগে সম্প্রতি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বৃটেনের সরকারদলীয় হুইপ এন্ড্রো স্টিফেনসন বলেছেন, ‘অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচনই বাংলাদেশের সব সমস্যা সমাধানের একমাত্র বিকল্প’। : বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া কোনো পথ নেই তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উপলদ্ধি করছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে জবাবদিহির রাজনীতি-সংসদ কোনোটিই হবে না। প্রহসনের নির্বাচন দেশের বহুমাত্রিক সর্বনাশ ইতিমধ্যেই ডেকে এনেছে। জাল-জালিয়াতির নির্বাচনের মূল্য দেশের মানুষই শুধু নয়, ক্ষমতাসীনদেরও দিতে হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতারা দেরিতে হলেও এখন বুঝেছেন, নেতাকর্মীদের বেপরোয়া অপকর্ম, প্রশাসনে দলবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অরাজকতা-দুর্নীতি আওয়ামী রাজনীতির ও দলের নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হুমকির মুখে ফেলেছে, ক্ষমতা থেকে নিরাপদে প্রস্থান কঠিন করে তুলেছে। আওয়ামী রাজনীতি ও নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাই এখন শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলনে বলেছেন, ‘দল ক্ষমতা হারালে টাকা পয়সা নিয়ে পালাতে হবে। দল ক্ষমতায় যদি না থাকে তখন অবৈধ উপার্জিত অর্থ দিয়ে কি করবেন (৩০.০৪.১৭ যুগান্তর)’। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান এমপি বলেছেন, ‘আমরা এমন অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যে, ডাঙ্গায় গেলে বাঘে খাবে, আর নদীতে গেলে কুমিরে খাবে। গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ আসনে এমপি নির্বাচন হওয়ার বিষয়টি সারা বিশে^র মানুষ নেতিবাচকভাবে নিয়েছে (২০.০১.১৭ যুগান্তর)’।  আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোঃ নাসিম আওয়ামী লীগ নেতা আক্তারুজ্জামানের স্মরণে আয়োজিত সভায় বলেছেন, ‘ক্ষমতায় আসতে না পারলে আমরা সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো (৬.১১.১৭ ইনকিলাব)’। আওয়ামী লীগ নেতা পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আজম খালেদ মোশাররফের ৪২তম মৃত্যুবার্ষিকীর সভায় বলেছেন, ‘আগামীতে ক্ষমতায় আসতে না পারলে আমরাও রোহিঙ্গাদের মতো হবো (১১.১১.১৭ নয়াদিগন্ত)’। : জাল-জালিয়াতির নির্বাচন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আওয়ামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, ক্ষমতা থেকে নিরাপদ প্রস্থানের পথও বন্ধ করে দিয়েছেÑএটা আওয়ামী লীগ নেতাদের কথাতেই বুঝা  যাচ্ছে। ক্ষমতা থেকে নিরাপদ প্রস্থানের এবং দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্বিঘœ-নিরাপদের নিশ্চয়তা আওয়ামী লীগের জন্য আবশ্যক হয়ে দেখা দেয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যগুলোতে চাউর হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন সে দিনের সমাবেশে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, পিঠ বাঁচাতে তাদের ক্ষমতায় আসতে হবে। কিন্তু আমরা আপনাদের মারবো না, কারণ সহিংসতায় আমরা বিশ^াস করি না (১৩.১১.১৭ আমাদের সময়)। ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের জুলুম ক্ষমা করে দেয়া হবে (১৩.১১.১৭ যায় যায় দিন )’। ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী রাজনীতির ভবিষ্যৎ ও নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত আওয়ামী লীগকে বিএনপি চেয়ারপারসন অভয় দিয়েছেন। : এ অভয় তিনি দিয়েছেন অনিবার্য কারণেই। বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চরমরূপ ধারণ করুক তা কেউই চায় না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অনিশ্চয়তা দেশে-বিদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি করে রেখেছে। বিশ^ব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ কমছে। দেশ ও জাতির স্বার্থেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখা যাবে না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করার একমাত্র উপায় স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য একাদশ সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন,  গুডগর্ভনেন্স, মৌলিক-মানবাধিকারের নিশ্চয়তা চাইলে জবাবদিহির রাজনীতি নিশ্চিত করতেই হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন জবাবদিহির রাজনীতির কথাই ব্যক্ত করেছেন তাঁর বক্তব্যে।  জন আকাক্সক্ষার এবং জাতীয় স্বাথের্র  প্রতিফলনই ঘটেছে বিএনপি চেয়ারপারসনের বক্তব্যে। : :





অনলাইন জরিপ

ফেনী জেলা আ’লীগের নেতারা বলেছেন, খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার নেপথ্য নায়ক নিজাম হাজারী। এরপরেও আ’লীগ মিথ্যাচার করবে বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
7915 জন