রাজনৈতিক চাপে বিপর্যস্ত ব্যাংক
হরিলুটের মূল নায়করা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
Published : Wednesday, 22 November, 2017 at 12:00 AM
গতকালের প্রিন্ট মিডিয়ায় দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর পৃথক চারটি রিপোর্টÑ ‘চরম অর্থ সঙ্কটে ১৪ ব্যাংক’, ‘৬৫০০ কোটি টাকা তাঁরা ফেরত দেননি’, ‘জালিয়াতির অভিযোগে মেঘনা ব্যাংকের এমডির পদত্যাগ’ ও ‘রাজনৈতিক চাপে বিপর্যয়ে ব্যাংকিং খাত’। রিপোর্টগুলোতে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে খুবই পরিষ্কার, দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ‘এলোমেলো করে দে মা/ লুটেপুটে খাই’। সর্বশেষ তথ্যমতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের মধ্যে ১৪টিতেই দেখা দিয়েছে নগদ অর্থ সংকট। ব্যাংকগুলো হচ্ছেÑ ব্যাংক এশিয়া, যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, এবি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সাউথ ইস্ট ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ও ফার্মার্স ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ চিত্র উঠে এসেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে এই ১৪ ব্যাংকের পরিচালনায় নগদ প্রবাহ বা অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। পরিচালনায় নগদ  প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার অর্থ ওই প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।  বিতরণ করা ঋণ প্রত্যাশা অনুযায়ী আদায় না হওয়া ব্যাংক পরিচালনায় নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ব্যাংকগুলোর  প্রকাশিত  প্রতিবেদনে স্বীকারও  করা হয়েছে, ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হয়ে পড়ার একটি অন্যতম কারণ হতে পারে ব্যাংকগুলো যে ঋণ বিতরণ করেছে তা কোয়ালিটি সম্পন্ন নয়। ফলে আশানুরূপভাবে ঋণ আদায় হচ্ছে না। ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক হওয়ার অর্থ কিছু না কিছু সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছেই। এ সমস্যার  দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। : প্রতিবেদন থেকে বোঝাই যায়Ñ ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণের নামে কার্যত চলছে হরিলুট ও জবরদখল যার লাগাম টেনে ধরার কোনো উদ্যোগ নেই। ফলশ্রুতিতে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে খেলাপি ঋণ। অনিয়মই হয়ে পড়েছে  নিয়ম। অভিযোগÑ ব্যাংকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রায় সবাই জড়িয়ে পড়েছে এর সঙ্গে। পত্রিকার রিপোর্ট মতে, জাল-জালিয়াতির সব ঘটনার প্রমাণ থাকলেও রাজনৈতিক চাপের কারণে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগে রাজনৈতিক চাপ শুধু সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন তা সংক্রমিত হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকেও।  ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এরই মধ্যে ফোকলা হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক তদারকি করে দুটি পদ্ধতিতেÑ একটি সরাসরি তদন্ত বা অনসাইট সুপারভিশন এবং অপরটি হচ্ছে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার মাধ্যমে তদারকি বা অফসাইট সুপারভিশন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকরা যেখানে গিয়ে হাত দিচ্ছেন সেখানেই নানা অনিয়ম পাচ্ছেন। এগুলো গণমাধ্যমে চলে আসায় ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছেÑ এমন অভিযোগে পরিদর্শকদের ক্ষমতা কমানো হয়েছে। আগে পরিদর্শকরা অভিযোগের ভিত্তিতে বিভাগের প্রধানের অনুমতি নিয়েই তদন্ত করতে পারতেন। এখন সেটি পারছেন না। উপরের অনুমোদন নিতে হচ্ছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভিজিল্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগকে অকেজো করে রাখা হয়েছে। মানিলন্ডারিং  প্রতিরোধ বিভাগ থেকেও বড় ধরনের কোনো তদন্ত হচ্ছে না। সব অভিযোগ রাখা হচ্ছে ফাইলবন্দি করে। ফলে তদন্তের মাধ্যমে তদারকি কার্যক্রম এখন অনেক শিথিল। ঋণ বিতরণে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা সরকারি সোনালী, বেসিক ব্যাংকে বেশি হয়েছে। অগ্রণী, জনতা, রূপালী, কৃষি ব্যাংকেও হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু ব্যাংকিং খাতের জড়িতদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির ব্যবস্থা নিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ঘটনার ব্যাপারে মামলা করলেও শাস্তির বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে। এ ঘটনা শুধু বেসিক, হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতির ক্ষেত্রে হয়েছে। এসব ঘটনার মূল নায়করা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। : আসলে মূল সমস্যাটা এখানেই। লুটেপুটে দেশের ব্যাংকগুলোকে প্রায় শেষ করে দেয়া হয়েছে। অথচ অপরাধীদের গ্রেফতার নেই, শাস্তি নেই। নামমাত্র কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া হলেও তা নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাঘব-বোয়ালরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। দু’চারজন যারা ধরা পড়েছেন তারাও নানা ফন্দি-ফিকির করে ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে মরিয়া। গতকালের পত্রিকায় খবর এসেছে, বহুল আলোচিত হলমার্ক, ডেসটিনি, বেসিক ও কমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির চারটি মামলায় পাঁচ প্রভাবশালী অভিযুক্ত ৬ হাজার ৫০৮ কোটির বেশি টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত কেউ একটি টাকাও জমা দেননি। এই হচ্ছে অবস্থা! অভিযোগ আছেÑ এরা ক্ষমতার সঙ্গে নানাভাবে ঘনিষ্ঠ। ফলে সমস্যার কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। আসলে যেখানে বেড়ায় ক্ষেত খায় সেখানে কীভাবে সম্ভব ক্ষেত রক্ষা! কিন্তু মনে রাখা জরুরি, দেশের ব্যাংকিং খাতে যা ঘটছে তা খুবই অশুভ আলামত। এর পরিণতি কখনই ভালো হতে পারে না।   : :





অনলাইন জরিপ

ফেনী জেলা আ’লীগের নেতারা বলেছেন, খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার নেপথ্য নায়ক নিজাম হাজারী। এরপরেও আ’লীগ মিথ্যাচার করবে বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
7934 জন