অপরিকল্পিত নগরায়ণে দুর্ভোগ
Published : Wednesday, 22 November, 2017 at 12:00 AM, Update: 21.11.2017 10:54:18 PM
অপরিকল্পিত নগরায়ণে দুর্ভোগআবুল কাশেম, দিনকাল : অপরিকল্পিতভাবে চলমান উন্নয়নের ফলেই ঢাকা শহর দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা শহরের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিতে প্রচন্ড হতাশা আর উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় রয়েছেন তারা। এই শহরের ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং ও স্থাপনা ভেঙে ফেলার জন্য বহুবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ এখন পর্যন্ত কিছুই হয়নি। অথচ ৭-৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডির মতো অবস্থা সৃষ্টি হবে নিঃসন্দেহে।  জনগণ  সুন্দর ও বাসযোগ্য শহরের স্বপ্নের  প্রত্যাশা করেন।  : বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ঢাকায় যানজটে প্রতিবছর ২-৩ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন কম হয়। রাস্তা দখলমুক্ত করতে পারলেই যানজট অর্ধেক কমে যাবে। যানজট কমানোর জন্য অনেক ফ্লাইওভার, ফুটওভার ও ইউলুপ নির্মাণ করা হয়েছে, যা পরিকল্পিতভাবে নির্মান হয়নি। এর ফলে যানজটতো কমেইনি বরং আরো বেড়েছে। : এদিকে গত ১৯ জুলাই ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকা একটি ‘স্মার্ট শহরে’ পরিণত করার বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সম্মেলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আখতার মাহমুদ  অনেকটা হতাশাগ্রস্ত হয়েই মন্তব্যে বলছেন, ঢাকা শহরের এই সঙ্কট থেকে আপাতত মুক্তির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তার মতে,  অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা এই শহরে লোকসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। শহরের  অবকাঠামো, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা কবে নাগাদ ঠিক হবে তার নিশ্চয়তা নেই। এই অসহনীয় অবস্থা  থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক কঠিন। : সূত্র মতে, ওই সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে উত্থাপিত তথ্যে বলছে, ঢাকা শহরের ঐতিহ্য ৪শ’ বছরের অধিক। বর্তমানে  এই শহরের  লোকসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। দেশের ধনী, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ শিক্ষিত বেশিরভাগ লোকের বাস এখানে। গরিব মানুষের সংখ্যাও অনেক।  বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের মানুষের ৩৬ ভাগই বাস করে ঢাকায়। আর বর্তমান প্রবণতা চলতে থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা হবে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি। কিন্তু যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই শহরটি গড়ে উঠার ফল হিসেবে ঢাকা পরিণত হয়েছে বসবাসের ক্ষেত্রে নিম্নমানের শহরে। সেইসঙ্গে ভয়াবহ যানজটের ফলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এই শহরের জীবনযাত্রা। : বিশ্বব্যাংকের মতে, গত ১০ বছরে সড়কে যান চলাচলের গতি ঘণ্টায় গড়ে ২১ কিলোমিটার থেকে কমে এখন ৭ কিলোমিটারে। যানজট, জলাবদ্ধতার মতো সংকটের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণেও ঢাকায় বেড়েছে ভূমিকম্প ও বন্যার ঝুঁকি। ৩৫ লাখ বস্তিবাসী প্রায়ই বঞ্চিত হচ্ছে নূ্যূনতম সুবিধা থেকেও। অপরিকল্পিত এই  শহরের অধিকাংশ রাস্তাই  ভাঙাচুরা। আবাসন, শিক্ষাঙ্গন ও বিনোদনের সংকট প্রকট। এই নগরীতে পানি, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশনের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জলাবদ্ধতা, রাস্তা দখল, অপরিকল্পিত ও জরাজীর্ণ বাড়িঘর, ব্যাপক চাঁদাবাজি, নিরাপত্তাহীনতা, ভয়াবহ যানজট ইত্যাদি বিদ্যমান।  দিন দিন এই শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বিশ্বের ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৭তম। বায়ু দূষণের দিক থেকে ঢাকা শহর প্রথম স্থানে রয়েছে। গত ১৯ জুলাই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী  ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ  হোসেন, ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আখতার মাহমুদসহ আরো অনেকে। : অপরদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হকও সম্প্রতি একটি অনলাইন দৈনিকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় ঢাকা শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রকৌশলী সামছুল হক বলেন, ঢাকা শহর থেকে বাংলাদেশের রাজধানী সুবিধাজনক এলাকায় সরিয়ে নেয়া প্রয়োজন।  রাজধানী প্রাকৃতিকভাবে উঁচু জায়গায়, বন্যামুক্ত, মাটি ভরাট করতে হবে না এমন জায়গায় হওয়া উচিত।  রাজধানী সরিয়ে নেয়ার জন্য বড় পরিকল্পনা এবং সময় নিতে হয়। একটি জায়গা নির্ধারণ করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব দেয়া উচিত। : তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহর ভয়াবহ যানজট, জলাবদ্ধতা, ঘনবসতিপূর্ণ, অস্বাস্থ্যকর একটি ঝুঁকিপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার রাস্তাঘাট ডুবে যায়। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। পুরো ঢাকা শহরেই দেখা যাচ্ছে দ্রুত  বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে একটি গ্রামের সব লোক একটি  বহুতল ভবনে বাস করছে। কিন্তু পাকিস্তান আমলে যে রাস্তা সেটাই আছে বরং অনেক ক্ষেত্রে  রাস্তা, খাল, ড্রেন কমেছে। ঢাকার সব জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। বসুন্ধরা সিটিতে জায়গা কিনে খুশি হলেও বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে সেই খুশি আর থাকবে না।  : অধ্যাপক সামছুল হকের মতে, রাজধানী হতে হবে স্টেডিয়ামের মতো। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, বুয়েট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যাওয়া আর উত্তরা থেকে আরেক জন বাংলাদেশ ব্যাংকে আসবে, তা কি কখনও সমান হতে পারে না।  প্রশাসনিক কার্যালয়, অফিস হবে দক্ষিণে আর আবাসিক এলাকা হবে উত্তরে- এমনটি কোনো নগরের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। তিনি বলেন, রাজউকের চেয়ারম্যানকে সারাক্ষণ টাকার পেছনে দৌড়াতে হয়। ভূমির উন্নয়ন করলে টাকা আসবে, এ চিন্তায় তাকে কাজ করতে হয়। সড়ক বিভাগ, এলজিইডিকে হাজার হাজার কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। আর রাজউককে বলা হচ্ছে, তোমার টাকায় উন্নয়ন করো। রাজধানীর অসহনীয় যানজট থেকে মুক্তির বিষয়ে পরামর্শ এসেছে। ঢাকা  শহরের ভবিষ্যৎ নিয়েও তারা তখনই হতাশ হয়েছেন। বুয়েটের অধ্যাপক একটু হতাশার সুরে জাপানি বিশেষজ্ঞকে বলেছিলেন, ধীরে ধীরে ঢাকার  মৃত্যু ঘটেছে। যেমন মরা গাছকে পানি দিয়ে আর বাঁচানো যায় না, ঠিক ঢাকা এখন সেই পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। : অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ পুত্রজায়ায় রাজধানী করেছেন ৭ হাজার একর জমির ওপর। তারা দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা নিয়েছেন বলেই মালয়েশিয়া আজ এত উন্নত দেশ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত পরিকল্পনা ছাড়াই নানা উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত মানের উন্নয়নে পৌঁছতে পারছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজধানীর জন্য ঢাকা শহরের বাইরে নেয়ার মতো একটি সম্ভাবনাময় এলাকা ছিল। সেটা হলো, পূর্বাচলের জমির পরিমাণ ছিল সাড়ে ৬ হাজার একর। পূর্বাচলেই রাজধানী হতো। শুধু পরিকল্পনার দরকার ছিল। কিন্তু  গুটিকয়েক মানুষকে  কোটিপতি বানিয়ে দেয়ার জন্য রাজউক এক মহা তুঘলকি কারবার করে পূর্বাচলের ওই জমিতে। বাংলাদেশ হচ্ছে একটি ব-দ্বীপ, এটাকে  প্লাবন ভূমিও বলা যায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই প্লাবিত হয়। রাজধানী সরানোর উপযোগী একমাত্র জায়গা ছিল সাভার, পূর্বাচল ও ভাওয়ালের গড় এলাকা।  : অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাজ হচ্ছে রাজধানীর উন্নয়ন। কিন্তু রাজউক এখন ব্যক্তির উন্নয়নে কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ের পরিবর্তে ব্যবহারে রূপ নিচ্ছে। সরকারগুলো পরিকল্পনা ছাড়াই চাপিয়ে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকারই এই পরস্থিতির জন্য দায়ী, রাজউকের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট থেকে। আজ পর্যন্ত পরিকল্পনাবিদ  রাজউকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাননি।  প্রেষণে পাঠানো লোক দিয়ে রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠান চলছে। পরিকল্পনার জন্য ধ্যান লাগে, জ্ঞান লাগে। রাজধানী সরালে ৫০ বছর পর কী রূপ নিতে পারে তার জন্য ধ্যান করতে হয়।  : :  





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

ফেনী জেলা আ’লীগের নেতারা বলেছেন, খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার নেপথ্য নায়ক নিজাম হাজারী। এরপরেও আ’লীগ মিথ্যাচার করবে বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
7940 জন