দুর্নীতিবাজ-লুটার-গুমকারীদের কি বিচার হবে না?
তানভীর আহমেদ
Published : Monday, 27 November, 2017 at 12:00 AM
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা ও ফৌজদারী অপরাধ সংগঠনের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুন্যাল আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ইতিমধ্যে শীর্ষস্থানীয় কয়েকজনের ফাঁসিও হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কেউ বিরোধিতা করেনি। তবে অনেকের প্রশ্ন ছিল এর যথাযথ আন্তর্জাতিক মান নিয়ে। এখন প্রশ্ন উঠেছে যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচার হয়েছে তার চেয়ে এখন আরও বেশি ভয়াবহ মানবাধিকার-অপরাধ ঘটছে। এর কি বিচার হবে না? এর বিচারও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হোক। এখন যারা ব্যাংক-বীমা লোপাট করছে, শেয়ারবাজারকে ধ্বংস করে ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীকে রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছে, ঋণ খেলাপির নামে জনগণের অর্থ লুটপাট করছে, সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, লুটপাটের মাধ্যমে দেশের ব্যাংক-বীমা-শিল্প কারখানা ধ্বংস করে দিয়েছে তাদের বিচার করতে হবে। : বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে তা থেকে আমরা কখন বের হতে পারবো? আদৌ পারবো কিনা? পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কিনা। আবার কোন কোন পত্রিকা রিপোর্ট করেছে দশ বছরের বাজেটের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে। এখনতো ব্রিটিশ ও পাকিস্তানীরা নেই। দেশের লোকেরাই অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যে জড়িতরা এই অর্থপাচার করেছে বলে অভিযোগে, গার্মেন্টস  সেক্টরের অনেক মালিক তাদের মুনাফার অর্থ দেশে না এনে বিদেশে রেখেছেন বলে অভিযোগ আছে। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫১,০০০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর তা বেড়ে হয়েছে ৬১,০০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এই ঋণ বেড়ে ৭৪,০০০ কোটি টাকা দাঁড়াতে পারে। ২০১৬ সালে ব্যাংকিং খাতে ৭০,০০০ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে সরকার। কৃষি ব্যাংকের ৭,০০০ কোটি টাকা ঋণের নামে মূলধন চলে গেছে। কৃষি ব্যাংক শিল্প ঋণ বিতরণ করেছে ৭,০০০ কোটি টাকার। কৃষি ব্যাংক নিয়মবহির্ভূত শিল্পঋণ বিতরণ করে লালবাতি জ্বলার অবস্থায় পৌঁছেছে। সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপ নিয়ে গেছে ৪,৫০০ কোটি টাকা। বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়ে গেছে প্রায় ১১,০০০  কোটি টাকা। বর্তমানে সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল চেয়েছে। রূপালী, জনতা, অগ্রণী, বেসিক ব্যাংকের থেকে চলে গেছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। দেশের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা খুবই করুণ। এছাড়া বেসরকারি যমুনা ব্যাংক. এনআরবি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের অবস্থাও ভালো নয়। এনআরবি ব্যাংকের মালিকরা নিয়ে গেছে ৬০০ কোটি টাকার মত। অফসোর ব্যাংকিং-এর নামে আরব বাংলা ব্যাংক থেকে চলে গেছে ৩০০ কোটি টাকা। ফার্মার্স ব্যাংক যা কিনা নতুন প্রজন্মের ব্যাংক, সেখান থেকে ৪০০ কোটি টাকার ঋণ খেলাপির অভিযোগ আছে। শেয়ার বাজার থেকে চলে গেছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ে ৪৫ বছরে লোকসান দিয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার মত। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লোকসান হয়েছে ৪৫ বছরে প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের লোকসান ১২ হাজার কোটি টাকার মত। ২০০০ সালে ফিলিপাইন সরকার লোকসানের কারণে ফিলিপাইনস এয়ারলাইন বন্ধ করে দেয়। আমরা বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছি। লোকসান দিতে দিতে দেউলিয়া হয়ে বিজেএমসি বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা আদমজীসহ অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে জনগণের অর্থ ও সম্পদ লুটপাট পৃথিবীর অন্য কোন দেশে হয় কিনা আমাদের জানা নেই। দেশের আইন-আদালত, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি, আদালত ও বিচার ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত। টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। শুল্ক ও কর বিভাগ পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। যারা জনগণের অর্থ লুটপাট করে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন তাদের কি বিচার হবে না এই প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। যদি বিচারের উদ্যোগ নেয়া না হয় তাহলে এর দায়ভার সরকারের। : দেশে যদি সুশাসন থাকতো, আইনের শাসন থাকতো তাহলে অপরাধীরা পার পেতো না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হতো না। তাহলে লুটপাট-চুরি-দুর্নীতি বন্ধ হতো। কিন্তু আমাদের শাসনব্যবস্থায় যেহেতু গলদ আছে, বিচার ব্যবস্থায় দুর্বলতা আছে, সেজন্য অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। কয়দিন পরে সংগঠিত হয়ে আবার নতুন অপরাধ সংগঠন করে। এখানে ইয়াবা ব্যবসায়ী ৪০ বছর জেল-দণ্ড পাওয়ার পর আবার উচ্চ আদালতে গিয়ে জামিন পেয়ে যায়। বড়ই বিচিত্র এই দেশ! অপরাধ করার পর যেহেতু মার্জনা বা ক্ষমা পাওয়া যায়, সেজন্য প্রভাবশালীরা ছাড়া পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে অপরাধ শুরু করে। দলীয় বিবেচনায় ফাঁসির আসামিকেও ক্ষমা করা হয়। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে দেশে যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থপাচার হয়েছে সে অর্থ উগান্ডা, বাহামা, মরিশাস, মাদাগাস্কার, মাল্টা, কানাডা, অস্ট্র্রেলিয়াসহ অনেক দেশে বিনিয়োগ হয়েছে। সে টাকা দিয়ে সেসব দেশে গার্মেন্টস-টেক্সটাইলসহ অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে একটা জোকস আছে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার একজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, নিউইয়র্কে যে এত ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে এর ক্রেতা কারা। : কর্মকর্তা হেসে বললেন, চীনাদের পাশাপাশি এখন অনেক বাংলাদেশীও নিউইয়র্কে ফ্ল্যাট কিনছে, বাড়ি কিনছে। তখন বারাক ওবামা প্রত্যুত্তরে বললেন, বাংলাদেশ তাহলে বেশ ধনী দেশ। বিদেশে বাংলাদেশীদের স্থান শক্ত দেখে অনেক বিদেশীর ধারণাÑসত্যিই বাংলাদেশ খুবই ধনী দেশ। কিন্তু ধনী কারা? দেশে তো সাড়ে ৪ কোটি লোক হতদরিদ্র। কোটি কোটি লোক বেকার। নিম্ন আয়ের লোকদের কেবল খাদ্য কিনতেই সব শেষ। তাহলে ধনী কারা? নিশ্চয় এরা দুর্নীতিবাজ, লুটার, পাচারকারী। আর এটা যারা করে তাদের যেহেতু বিচার হয় না, তাই তারা সরকারের-সংশ্লিষ্ট। এদের কি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হবে? : জনগণের প্রশ্নÑ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলে ষাটের দশক ও সত্তরের দশকে সামরিক শাসন আমলে যে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা হয়েছিল, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে তার বিচার হচ্ছে। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাসদ, সর্বহারা, সাম্যবাদী দলের যে ৫০,০০০ রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছিল, সিরাজ সিকদার নিহত হয়েছিলেন তার বিচার হবে কিনা? ১৯৭৪ সালে মানবসৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে যে ৩ লাখ লোক নিহত হয়েছে তার বিচার হবে কিনা। জনগণ মনে করে সকল হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হওয়া উচিত। : ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড-গুম-খুন হয়েছে তারও বিচার হওয়া উচিত। বিচার পাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে দেশে আইনের শাসন, সুশাসন ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সর্বোপরি মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অপরাধের বিচার হওয়া উচিত। তাহলেই দেশ একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। রাজনৈতিক অপরাধের পাশাপাশি ব্যাংক বীমা, শেয়ারবাজার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর লুটপাটের সুষ্ঠু বিচার হওয়া দরকার। অপরাধী যত বড় হোক না কেন তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। তাহলেই দেশ অপরাধমুক্ত হবে। দুর্নীতি ও দুঃশাসন মুক্ত হবে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আইনের শাসন কায়েম হবে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। সেজন্য দরকার শান্তিকালীন অপরাধীদের বিচার করা। ফৌজদারী অপরাধ অপরাধই সেটা যুদ্ধকালীন সময়ে হোক আর শান্তিকালীন সময়ে হউক, এতে অপরাধের কোন ব্যত্যয় ঘটে না। কথার ফুলঝুরি না ছড়িয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচার করুন। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তা না হলে একদিন জনতার আদালতে এর জবাব দিতে হবে। : লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট : :





অনলাইন জরিপ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, রংপুর সিটি নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে। আপনিও কি তেমন আশা করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
14961 জন