অনিশ্চিত পদ্মাসেতু
৪২টি পিয়ারের মধ্যে কাজ হয়েছে ২টি, ১৪টি নকশা চূড়ান্ত হয়নি, ব্যয় বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ
Published : Monday, 27 November, 2017 at 12:00 AM, Update: 26.11.2017 9:34:51 PM
বিশ্বব্যাংক, জাইকা ও আইডিবির অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু শুরুতেই বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ এনে পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে সরে যায়। পরে জাইকা ও আইডিবিও চলে যায়। এই অবস্থায় সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মাসেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০১৪ সালের ২৮ জুন পদ্মাসেতু নির্মাণে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই করে সরকার। তাতে খরচ  ধরা হয় ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে সেতুর কাজ শেষ করার কথা ছিল। গত ১ অক্টোবর বিভিন্ন পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল যে, দৃশমান হলো পদ্মাসেতু। ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুটির জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮ নং খুঁটির ওপর বসিয়ে দেয়া হয়েছে প্রথম স্প্যান (সুপার স্ট্রাকচার)। : গতকালের একটি জাতীয় দৈনিকে বলা হয়েছে, মেয়াদ বাড়িয়ে যে সময়ের লক্ষ্য নিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ চলছে, কাজ তা থেকে ৮ মাস পিছিয়ে রয়েছে। ফলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সেতুর কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সংশয় প্রকাশ করেছে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। পদ্মায় মূল সেতু নির্মাণে ২০১৪ সালের নবেম্বরে কাজ শুরু হয়, কিন্তু নদীশাসন ও সংযোগ সড়কসহ অন্যান্য কাজ শুরু হয় তারও আগে। প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীর পর ২০১৫ সালে তা শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। কিন্তু সেতুর প্রথম স্প্যানের পিয়ার স্থাপন করা হয় ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। তারপরও দ্বিতীয় সংশোধনীতে সময় বাড়িয়ে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ২০১৮ সালের নবেম্বরে। ইতিমধ্যে সেতুর ব্যয় বেড়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। প্রশ্ন হচ্ছে, সেতুর মূলকাজ শুরুর পর যেখানে ২ বছর লেগেছে প্রথম স্প্যান (দুটি খুঁটি) বসাতে সেখানে আগামী ১২ মাসের মধ্যে (২০১৮ নবেম্বর) বাকি ৪০টি খুঁটি বা পিয়ার বসানো কি সম্ভব হবে? সেতুতে থাকবে মোট ৪২টি পিয়ার (খুঁটি), এর মধ্যে ১৪টির ডিজাইন (নকশা) এখনও পাওয়া যায়নি। কবে পাওয়া যাবে তা-ও কর্তৃপক্ষ জানে না। প্রথম স্প্যান বসানোর পর দ্বিতীয়টি কবে বসবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলেছে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইউ)। আইএমইউ এক প্রতিবেদনে বলেছে, পাইলিংয়ের জন্য চারটি হ্যামার প্রকল্প এলাকায় থাকলেও তার দুটি মাত্র কার্যকর রয়েছে। অর্থাৎ দুটি অচল বা অকার্যকর। ধারাবাহিকভাবে কোন স্প্যান কোন সময়ে স্থাপন করা হবে তার কোনো ধারাবাহিক পরিকল্পনা নেই। মাওয়া প্রান্তে ডায়াডাক্টের মাত্র ১১ শতাংশ কাজ হয়েছে। সিনো হাইড্রোর সঙ্গে যে ৮ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার চুক্তি হয়েছে তার মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। সরকার হয়ত আশা করেছিল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই পদ্মাসেতু নির্মাণ করে এটা নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু তা যে আদৌ সম্ভব হবে না তা বোঝা যায় কাজের অগ্রগতি দেখে। এই সরকার পদ্মাসেতুর কাজ যে শেষ করে যেতে পারবে কিনা সেই লক্ষণ দেখা যায় না। দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে কতগুলো মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এই মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলেই জনগণকে বলা যাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দেশ এগিয়ে কোন দিকে যাচ্ছে তা জনগণ বুঝতে পারে। কেবল পদ্মাসেতু দিয়ে বিচার করলেই হবে না, রাজধানীর যানজট নিরসনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প হাতে নেয়া হয় ২০১১ সালে। কাজ শেষ করার কথা ছিল ২০১৬ সালে। এরপর সময় বাড়ানো হয় ২০২০ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে নির্মাণকাজ হয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। কাজের ধরন দেখেই বোঝা যায় ২০২০ সালেও কাজ শেষ হবে না। সংশ্লিষ্ট মহলও তাই মনে করছেন। প্রকল্পের বার বার নকশা বদল, অর্থ সংকট লেগেই আছে। অর্থ সংকটের সমাধান না হলে কখনোই প্রকল্পটি দৃশ্যমান হবে না। সরকারের লিফলেট জাতীয় একটি পত্রিকা ১৭ নবেম্বর বলেছে, বর্তমানে ৬০০ সেতু ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময়ে ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। কিন্তু সরকারের এদিকে খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। কারণ সরকার ব্যস্ত জনগণকে উন্নয়নের গল্প শোনাতে। দেখাচ্ছে নানা স্বপ্ন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কোনো অগ্রগতি নেই। এখন আবার শোনানো হচ্ছে ঢাকার চারপাশে পাতাল রেল নির্মাণের। বলা হচ্ছে বিশ্বের উন্নত নগরীর আদলে ঢাকার চারপাশে হবে আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে (পাতাল রেল)। রাজধানীবাসীকে যানজট থেকে রেহাই দিতে বিশাল এ মেগা প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য প্রাথমিকভাবে চারটি রুট ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু এই টাকা কে দেবে তার কোনো উৎস নেই। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর সরকার যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়েছে তা দৃশ্যমান। কেননা দাতারা ঋণ-সহায়তা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি জাতীয় বাজেট ঘাটতি পূরণেও দাতারা এগিয়ে আসছে না। যা দিচ্ছে তা চলে যাচ্ছে তাদের ঋণের সুদ পরিশোধে। ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দাবি করা হলেও দাতা সংস্থা বলছে সরকারের এ দাবি সঠিক নয়। অর্থাৎ উন্নয়নের নামে সরকার অসত্য বলছে। অন্যদিকে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বন্ধ। বিদেশী বিনিয়োগ না এলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ হ্রাস পায়। কমে গেছে রেমিট্যান্স। রফতানি হ্রাস পেয়েছে, বেড়েছে আমদানি। বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে না। আমদানি বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক ঋণ সহায়তা হ্রাস পাওয়ায় ও বিভিন্ন প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে হাত পড়েছে। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সূচকে নিম্নগতি। ছোট ও মাঝারি লাখ লাখ শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যেমন উৎপাদন কমেছে, রফতানি কমেছে, তেমনি বেকারত্ব বেড়ে গেছে। কোটি কোটি লোক বেকার। উচ্চশিক্ষিত যুবকরাও বেকার। দেশে সাড়ে চার কোটি লোক হতদরিদ্র। খাদ্য কিনতে গিয়ে তারা অন্য জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারে না। অর্থাৎ ক্রয়ে সক্ষমতা হারিয়েছে তারা। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। ডলারের বিনিময়ে টাকার মান কমেছে। সরকার চলছে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থ যোগাড় করে। উচ্চ সুদে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। : এই যখন সরকারের অবস্থা, তখন উন্নয়নের জোয়ার দেখাতে মেগা প্রকল্প বা অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণ করে, প্রকল্পের টাকা নয়ছয় করে উন্নয়নের স্বপ্ন শোনাচ্ছে জনগণকে, এ যেন ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে স্বপ্নে দেখা কিংবা ভাঙাঘরে শুয়ে আকাশের চাঁদ দেখার মতো। আমরা এই ধরনের উন্নয়নের গল্প শুনতে চাই না, আমরা চাই দেশের সমৃদ্ধি, জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন, নিরুদ্বিগ্ন জীবযাপন।      : :





অনলাইন জরিপ

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, রংপুর সিটি নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে। আপনিও কি তেমন আশা করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
14947 জন