দিনকালকে দেয়া শেষ সাক্ষাৎকারে রাহিজা খানম ঝুনু
Published : Tuesday, 28 November, 2017 at 12:00 AM
দিনকালকে দেয়া শেষ সাক্ষাৎকারে রাহিজা খানম ঝুনুরফিকুল ইসলাম রফিক, দিনকাল   : পিতা-মাতা দুজনেই সঙ্গীতের সাথে জড়িত ছিলেন। পারিবারিকভাবে সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা রাহিজা খানম ঝুনু ৫ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় এ অঙ্গনে জড়িয়ে যান। নৃত্যকলাকে তিনি মনে প্রাণে লালন করতেন নিবিড়ভাবে। পাকিস্তান আমলে বাঙালি সংস্কৃতি চর্”া যখন দুঃসাহসিক কাজ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট যখন গোঁড়ামি ও অজ্ঞতায় ঘেরা তখন নৃত্যকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া অনেকটা যুদ্ধের শামিল। সেই শিকল ভেঙে তিনি এগিয়ে গেছেন। লক্ষ্য ছিল নৃত্যকলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। তখন মেয়েদের সংস্কৃতি চর্চায় সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় হাজারো বাধাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। রাহিজা খানম ঝুনু সেসব প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নৃত্যচর্চা শুরু করেন। চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বামীর প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানে  যোগ দিতে সর্বশেষ ভালুকায় এসেছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী ও দেশের নৃত্যগুরু মাতা রাহিজা খানম ঝুনু। অনুষ্ঠান শেষে বাসায় আসেন। নিজ বাসায় বসে দৈনিক দিনকালকে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন দৈনিক দিনকালের ভালুকা প্রতিনিধি মো: রফিকুল ইসলাম রফিক। জীবনের নানা প্রতিকূলতাকে কিভাবে পাড়ি দিয়েছেন সে স্মৃতি যেমন রয়েছে তেমনি বলেছেন সুখময় মুহূর্তগুলোর কথা। : বরেণ্য এ শিল্পী বলেন, ‘রাখালের ঘুমন্ত রাজকন্যা’ নৃত্য নাট্যের মাধ্যমে তিনি প্রথম আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ষাটের দশকে (বর্তমান) ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ মঞ্চস্থ করেন। একই দিনে দুবার এটি প্রদর্শিত হয়। তখন পল্লীকবি উপস্থিত থেকে নৃত্যনাট্যটি উপভোগ করছিলেন। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ নৃত্যনাট্যে সাজুর চরিত্রটিতে অংশ নিয়ে তিনি চারদিকে হৈ চৈ ফেলে দেন। তার অনবদ্য শিল্পশৈলী উপস্থাপনে পল্লী কবি এতোটাই খুশি হন যে, তাকে নকশী কাঁথার মাঠের কাল্পনিক সাজু হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ষাটের দশকে রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ নৃত্য নাট্যটি মঞ্চায়ন করে চারদিকে সাড়া ফেলে দেন এবং নিজেও খ্যাতিলাভ করেন। তাকে অনুসরণ করে নৃত্যশিল্পের সঙ্গে বাঙালি মেয়েরা নিজেদের সম্পৃক্ত করতে শুরু করেন। এ কারণেই তাকে ভূষিত করা হয় ‘নৃত্য গুরুমাতা’ উপাধিতে। অসীম সাহসিকতা, নিষ্ঠা এবং অধ্যবসায়ে তিনি নৃত্য চর্চাকে নিয়ে আসেন অনন্য উচ্চতায়। নৃত্যে একটি নতুন ধারা সৃষ্টির মাধ্যমে সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষার্থী গড়ে তোলেন। নিজের মেয়েদেরকেও নৃত্যকলায় সম্পৃক্ত করেন। দেশের তারকা খ্যাতি পাওয়া প্রায় সকলেই তার নিজ হাতের গড়া। যারা আজ স্বনামে দেশে-বিদেশে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।   : রাহিজা খানম ঝুনু ১৯৪৩ সালের ২১ জুন মানিকগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবু মোহাম্মদ আবদুল্লাহ খান ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা সফরুন নেছা। রাহিজা খানম ঝুনু ১৯৫৬ সালে নৃত্যে তালিম নিতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা)’য় ভর্তি হন। তিনি ছিলেন বাফার প্রথম ব্যাচের ছাত্রী। ১৯৬০ সালে বাফা থেকে পাস করেন এবং তৎকালীন সময়ে মাত্র ৫ টাকা বেতনে তিনি সেখানেই নৃত্যশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ বছর শিক্ষকতার পর ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পান। বাংলাদেশ নৃত্য শিল্পী সংস্থা ও বাংলাদেশ টেলিভিশন নৃত্য শিল্পী সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেন এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। গুণী এ শিল্পী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯০ সালে একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। তার উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি সংবর্ধনা, বেনুকা ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক গুণীজন সংবর্ধনা, রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সংস্থা কর্তৃক শ্রদ্ধাঞ্জলি, বুলবুল চৌধুরী স্মৃতি পদক, ঢাকা সিটি মেয়র স্বর্ণ পদক, মানিকগঞ্জ সাহিত্য সাংস্কৃতিক একাডেমি পদক, শান্ত মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় সম্মাননা ইত্যাদি। নৃত্য শিল্পী ও দলনেতা হিসেবে পৃথিবীর ৩০টির অধিক দেশে বাঙালি সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করেছেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সংস্কৃতি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সর্বদা হাসি-খুশি ও খোলা মনের মানুষ ছিলেন তিনি। তার সব সময় পরামর্শ ছিল বড় হতে গেলে আগে ভাল মানুষ হতে হবে। হিংসা, পরশ্রীকাতরতা তার মধ্যে ছিল না। সত্য কথা বলায় তিনি ছিলেন দ্বিধাহীন। সদালাপী মানুষ। সব সময় সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। তার আকুতির মধ্যে ছিল দীর্ঘ স্মৃতি বিজরিত বুলবুল ললিতকলা একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা)’র ভবিষ্যৎ নিয়ে। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি স্বমহিমায় দেখে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। :  উল্লেখ্য, তার স্বামী ভালুকার তিনবারের এমপি প্রয়াত আমানউল্লাহ চৌধুরী দীর্ঘ বছর বাফার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাহিজা খানম ঝুনুর সবশেষ আবিষ্কার ছিল বাংলাদেশ ললিতকলা একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা)। তিনি এটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বামী এমপি হওয়ার সুবাদে বিএনপিকে সংগঠিত করতেও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি। ভালুকায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন একটি জনপ্রিয় নাম। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি তার ছিল অকৃত্রিম ভালবাসা। প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাহিজা খানম ঝুনু জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বর্তমান জাতীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। উল্লেখ্য, রবিবার সকাল ৭.৩০ মি. গুণী এ শিল্পী ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

দ্রুত রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান দেখছেন না ব্রিটিশ মন্ত্রী। আপনিও কি তাই দেখছেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
677 জন