মৃত্যুদণ্ড বহাল ১৩৯ জনের
Published : Tuesday, 28 November, 2017 at 12:00 AM, Update: 27.11.2017 10:34:31 PM
মৃত্যুদণ্ড বহাল ১৩৯ জনেরদিনকাল রিপোর্ট : ইতিহাসে নজিরবিহীন রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর বর্তমানে বিজিবি সদর দফতরে বিদ্রোহ ও হত্যা মামলায় ডিএডি তৌহিদসহ ১৩৯ জনের ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতের দেয়া রায়ে ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৮ জনের যাবজ্জীবন বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এছাড়াও ১৮২ জনকে দেয়া ১০ বছরের সাজাও বহাল রেখেছে। গতকাল সোমবার বিকেলে হাইকোর্টে তিন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ আলোচিত বিডিআর হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড কার্যকরে অনুমতি চেয়ে করা আবেদন) ও আপিলের রায়ে এই সাজা ঘোষণা করেছেন। ওই বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে অপর দুই বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার টানা দুই দিনে এই রায় ঘোষণা করেন। এর আগে ২০১৩ সালে এই মামলায় বিচারিক বিশেষ জজ আদালত (নিম্ন আদালত) ১৫২ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে নিম্ন আদালতে রায়ে ১৬০ জনের যাবজ্জীবন এবং ১৮২ জনকে ১০ বছরের সাজা দেয়া হয়েছিল। এদিকে হাইকোর্টের রায়ে ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসি বহাল রাখা হয়। এ ছাড়া চারজনকে খালাস দেয়া হয়েছে। নিম্ন আদালতে ফাঁসির দন্ড পাওয়া ৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডও দেয়া হয়। তবে এদের মধ্যে এক আসামি মারা যাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায় প্রদানকালে হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দেন দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তুলে ধরেন নিজেদের ৭টি সুপারিশ। বিশেষ জজ আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছিল। হাইকোর্টও ৬৯ জনের মধ্যে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন। এছাড়া সাত বছর করে চারজনকে কারাদন্ড এবং ৩৪ জনের খালাসের রায় বহাল রাখা হয়েছে। বিশেষ জজ আদালত এই মামলার ৮৫০ আসামির মধ্যে আরো ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১৮২ জনকে ১০ বছরের কারাদন্ড, ৮ জনকে ৭ বছরের কারাদন্ড, চারজনকে ৩ বছরের কারাদন্ড। এরমধ্যে ২৯ জনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবী এবং গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্টের এই বেঞ্চ। হাইকোর্ট বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ইপিআর পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত এই বাহিনী দেশে-বিদেশে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের কিছু সদস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হত্যাকান্ড ঘটিয়েছেন। এই কলঙ্কচিহ্ন তাদের অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে। একসঙ্গে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার নজির ইতিহাসে নেই। এই হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক বিশেষ জজ আদালত রায় দিয়েছিলেন। ওই রায়ের পর উভয়পক্ষের করা আপিলের ওপর ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। এবং ৩৭০তম দিনে শুনানি করে গত ১৩ এপ্রিল শুনানি শেষ হয়। ওইদিন শুনানি শেষে হাইকোর্ট মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এরপর হাইকোর্ট রায়ের জন্য ২৬ নভেম্বর তারিখ ধার্য করেন। : ভেতরের ও বাইরের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে : গতকাল সোমবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে দ্বিতীয় দিনের মতো অসমাপ্ত রায় পড়া শুরুতে রায়ের পর্যবেক্ষণ দেন বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার। এর আগে গত রবিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রথম দিনে রায়ের বলা হয়েছে, পিলখানা হত্যাকান্ড ইতিহাসের নৃশংস ও বর্বরোচিত ঘটনা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টে একটি শৃঙ্খলিত বাহিনীকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। গতকাল বলা হয়েছে, বিডিআরে কোনো সেনা অফিসার থাকবে না, সব ক্ষমতা তাদের থাকবে বিডিআর-এর। এটিই ছিল হত্যাকান্ডের মূল লক্ষ্য। তবে রায়ের পর্যবেক্ষণে তিন বিচারপতিই একমত পোষণ করেছেন। এই রায়ে এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি পর্যবেক্ষণ রয়েছে। মূল রায়টি প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার। : এই রায়কে পৃথিবীর ইতিহাসের বড় রায়গুলোর একটি উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির প্রচলন নেই। মানবাধিকারের কথা বলা হয়। হত্যা একটি জঘন্য অপরাধ। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি সমাজের কাছে নজির রাখবে। অপরাধীদের অপরাধ করতে নিরুৎসাহিত করবে। এ জন্য হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োজন। : এ ঘটনায় দেশের বাইরের শক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে আদালত বলেন, সব সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা প্রতীয়মাণ হয় যে, এটি ভেতর ও বাইরের গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে। আসামি সংখ্যার দিক থেকে পিলখানা হত্যাকান্ড মামলা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মামলা। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬  ফেব্রুয়ারি পিলখানায় ওই হত্যাযজ্ঞে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। : হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেছেন, তৎকালীন বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কেন এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে আগে জানতে পারেননি। সেই ব্যর্থতা খুঁজতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। বিজিবির মহাপরিচালকের উদ্দেশে বলেন, কোনো সমস্যা এলে তা তাৎক্ষণিক সমাধান করতে হবে। বিজিবির জওয়ানরা কোনো সমস্যা নিয়ে এলে তা মীমাংসা করতে হবে এবং বিজিবিতে সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের মধ্যে পেশাদারি সম্পর্ক থাকতে হবে। : বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, কেন ওই সময় বিডিআর ডাল-ভাত কর্মসূচি নিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো কর্মসূচি নেয়া  যাবে না। সে ব্যাপারে বিজিবিকে সতর্ক করেন তিনি। বিচারপতি মো. শওকত হাসেন বলেন, কোনো সেনা কর্মকর্তা সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে থাকবে না। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের থাকার বিষয়টি নিয়েই বিদ্রোহে অংশ নেয়াদের মূল মনোভাব। তিনি বিজিবি জওয়ানদের সঙ্গে ঔপনিবেশিক (কলোনিয়াল) আমলের মতো ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, একই দেশে এখানে সবাই ভাই ভাই। : হাইকোর্টের ৭ দফা সুপারিশ : ১. অপারেশ ডাল-ভাত কর্মসূচিতে বিডিআরের মতো এ ধরনের ফোর্সকে যুক্ত করা উচিত হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে এ জাতীয় কর্মসূচি যেন আর না নেয়া হয়। ২. বিজিবি আইন অনুযায়ী বাহিনীতে  সৈনিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা উচিত। বিজিবির কাঠামোতে বাহিনীর আইন অনুযায়ী সে সম্পর্ক প্রতিপালন করা প্রয়োজন। এজন্য সময় সময় অভ্যন্তরীণ মতবিনিয়ের আয়োজন করা  যেতে পারে। ৩. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি দাওয়া পাঠানো হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা নিরসন করা হয়নি। তাই ভবিষ্যতে দাবি-দাওয়া থাকলে দ্রুত তা নিষ্পত্তি করতে হবে। পিলখানায় বিদ্রোহের আগে অধস্তনদের কিছু দাবি-দাওয়া বিডিআরের ঊর্ধ্বতনদের কাছে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। এ ধরনের আমলাতান্ত্রিকতা দূর করতে হবে। ৪. বাহিনীর সদস্যদের কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানে বিজিবির ডিজি দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন। তাদের আর্থিক সুবিধাসহ যাবতীয় সুবিধা প্রদানে ব্যবস্থা নেবেন। যদি কোনো প্রচ্ছন্ন  ক্ষোভ থেকে থাকে, তা প্রশমন করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। ৫. বাহিনীতে কারো যদি কোনো পাওনা থাকে সেটিও দ্রুত সমাধান করতে হবে। ৬. যেকোনো সমস্যা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। ৭. বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দা বাহিনী ছিল। পিলখানায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল সংরক্ষিত। গোয়েন্দা বাহিনী বিদ্রোহের আগে  কোনো তথ্য দিতে কেন ব্যর্থ হয়েছে কেন তারা নিশ্চুপ ছিল? এটা কর্তৃপক্ষকে তদন্ত করে দেখতে হবে। :   : : :  





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

দ্রুত রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান দেখছেন না ব্রিটিশ মন্ত্রী। আপনিও কি তাই দেখছেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
671 জন