চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে : প্রশাসনে ক্ষোভ বাড়ছে
Published : Wednesday, 29 November, 2017 at 12:00 AM, Update: 28.11.2017 10:44:05 PM
আবদুল্লাহ জেয়াদ, দিনকাল : চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনে ােভ ও অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা বছরের পর বছর স্বপদে বহাল থাকতে তদবির করে বাড়াচ্ছেন চুক্তির মেয়াদ। এর ফলে ওপরের দিকে পদ ব্লকড হয়ে যাচ্ছে। নিচের দিকে থাকা কর্মকর্তারা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কাক্সিত পদে পদোন্নতি পেয়ে দায়িত্ব নিতে পারছেন না। এ অবস্থায় একবুক কষ্ট আর আপে নিয়ে কেউ কেউ নিচের পদে থেকেই অবসরে যাচ্ছেন। : জনপ্রশাসনে মোট কর্মকর্তা আছেন ৫ হাজার ৭৭১ জন। এর মধ্যে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে কর্মকর্তার সংখ্যা পদের চেয়ে অনেক বেশি। যেমন উপসচিবের ৮৫০টি পদের বিপরীতে কর্মকর্তা রয়েছেন ১ হাজার ৫৫৪ জন। যুগ্ম সচিবের ৪৫০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৭৮৭ জন। অতিরিক্ত সচিবের শতাধিক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪৩৫ জন। রেকর্ড সংখ্যক নিয়োগের পরও সরকারি চাকরিতে শূন্য পদ বাড়ছে। জনপ্রশাসনে পদ ছাড়াই ঢালাও পদোন্নতি হচ্ছে। এতে পদোন্নতি পেয়েও অধিকাংশ কর্মকর্তা আগের পদেই চাকরি করছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, পদোন্নতি নিয়ে প্রশাসনে এক ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থা চলছে। : পদ ছাড়া ঢালাও পদোন্নতির কারণে জনপ্রশাসনে নিয়মিত কর্মকর্তারা পদ পাচ্ছেন না। অথচ উল্টো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে এই সমস্যা আরও বাড়ানো হচ্ছে। এ নিয়ে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে ােভের সৃষ্টি হয়েছে। : বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও দূতাবাস মিলিয়ে ১৪২ জন কর্মকর্তা চুক্তিতে চাকরি করছেন। তাদের মধ্যে ১২ জন সচিব রয়েছেন, যারা অবসরে যাওয়ার পরও চুক্তিতে আছেন। নিয়মিত কর্মকর্তা থাকার পরও চুক্তিতে ১২ জন সচিবকে দায়িত্ব দেয়ায় বছরে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রদূত, সচিব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন কমিশন ও কর্তৃপরে চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক, হাসপাতালের পরিচালকসহ রেলওয়ের কারিগরি পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন পদে চুক্তিতে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ১৩১ জন প্রথম শ্রেণির। তারা গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-৫-এর কর্মকর্তা। বাকি ১১ জন দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যায়ের কর্মকর্তা। আইন মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগই চলছে চুক্তিভিত্তিক সচিব দিয়ে। এর মধ্যে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক ইতিমধ্যে তিন দফায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। সব মিলিয়ে পাঁচ বছর চুক্তিতে থাকছেন তিনি। প্রথমে এক বছর চুক্তিতে নিয়োগ পান, এরপর দুই বছর। ওই দুই বছরের মধ্যে চুক্তিতে থাকা অবস্থায় জ্যেষ্ঠ সচিবও হন। সর্বশেষ ১৪ নভেম্বর থেকে আগামী দুই বছরের জন্য তাকে একই পদে চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। : আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হককে গত ৬ আগস্ট অবসরোত্তর ছুটি বাতিল করে একই পদে দুই বছরের জন্য চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ দেয় সরকার, যা পরের দিন থেকে কার্যকর হয়। তার এই নিয়োগ আদালত পর্যন্ত গড়ায়, যা এখন বিচারাধীন। ৭ নভেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরীকে ১০ নভেম্বর থেকে ছয় মাসের জন্য একই পদে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুজন সচিবের মধ্যে দুজনই চুক্তিতে আছেন। মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীকে অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার পর গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর থেকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। আগামী মাসে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তাকে আরেক দফায় চুক্তিতে নিয়োগ দেয়ার আলোচনা চলছে। এই পদের জন্য একাধিক সচিব চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগমও আছেন চুক্তিতে। তথ্যসচিব মরতুজা আহমেদ গত জানুয়ারি থেকে চুক্তিতে আছেন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার গত মে থেকে দুই বছরের জন্য চুক্তিতে আছেন। : এ ছাড়া সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ, ইতালির রাষ্ট্রদূত আবদুস সোবহান সিকদার, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপরে (বেজা) চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী আছেন চুক্তিতে। : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, মেয়াদ শেষে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন আরও কিছু কর্মকর্তা। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের েেত্র নীতিমালা নেই। সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়া ও স্বজন প্রীতি এই নিয়োগের অলিখিত প্রধান যোগ্যতা। নিয়মিত যোগ্য কর্মকর্তা থাকার পরও চুক্তিতে নিয়োগ দিলে সরকারের আর্থিক খরচ হয়। গাড়ির খরচ, বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা ছাড়াই একেকজন সচিবের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা। আর একেকজন জ্যেষ্ঠ সচিবের মূল বেতন ৮২ হাজার টাকা। মুখ্য সচিবের মূল বেতন ৮৬ হাজার টাকা। বর্তমানে সচিব আছেন ৭৯ জন। : নীতিমালা না থাকায় জনপ্রশাসনে প্রেষণে নিয়োগ হচ্ছে সামরিক কর্মকর্তাদেরও, যা নিয়ে ােভ রয়েছে জনপ্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের। চলমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরোধিতা করে ২০১৪ সালের ১ মার্চ জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের কাছে একটি চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছিলেন। কিন্তু পাল্টায়নি পরিস্থিতি, যথারীতি চলছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। : সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনের বিশেষায়িত ও কারিগরি পদের েেত্র যেখানে দ লোকের সংখ্যা খুবই কম সেখানে শুধু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। কিন্তু এই রেওয়াজ থেকে বের হয়ে এখন দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঢালাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকার শুরুতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দিলেও এ সময়ে এসে আবার গণহারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিচ্ছে। এটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চাকরির মেয়াদ শেষে সাধারণত সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তারাই তদবির করে চুক্তিতে নিয়োগ পান। এতে নিয়মিতদের মধ্যে যোগ্য অনেক কর্মকর্তাই পদোন্নতি পাচ্ছেন না। সচিব পদে বেশ কয়েকজনকে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়ায় দ ও যোগ্য অতিরিক্ত সচিবরা সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাচ্ছেন না। : এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান একটি গণমাধ্যমকে  বলেন, কিছু বিশেষায়িত পদ ছাড়া কোথাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিপে আমি। কারণ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফলে যারা পরবর্তী সময়ে ওইসব পদে যাওয়ার যোগ্য তারা হতাশ হন। তাদের পদোন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাদের মধ্যে ােভ, অসন্তোষ, হতাশা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এতে প্রশাসনিক কাজের গতি ব্যাহত হবে। এখন চলছে ফেভার ডিস্ট্রিবিউন কালচার। যাকে পছন্দ হয় চুক্তিতে রেখে দেয়, যাকে পছন্দ হয় না বিদায় করে দেয়। তিনি বলেন, এখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মূল শর্ত হল দলীয় মনোভাব, দলীয় আনুগত্য। কিন্তু এটা প্রশাসনের ভারসাম্য নষ্ট করে। : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

মির্জা ফখরুল ইসলাম পিলখানা হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। আপনিও কি তাই চান?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
33796 জন