লুটপাটের জন্যই নয়া ব্যাংক
Published : Wednesday, 29 November, 2017 at 12:00 AM, Update: 28.11.2017 10:43:20 PM
লুটপাটের জন্যই নয়া ব্যাংকআবদুল্লাহ জেয়াদ, দিনকাল : বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে হরিলুট চলছে। আর ওই হরিলুট করার জন্য সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন ব্যাংককে। অধিকাংশ ব্যবসায়ী গ্রুপের মালিকরাই তা করছেন। হরিলুট করতে গিয়ে একের পর এক ব্যাংক ফাঁকা করে ফেলা হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাদের পকেট ভরছেন। আর নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন। এবার আরও তিনটি নতুন ব্যাংক অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। : অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘পিপলস ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি ব্যাংকের অনুমোদন পাচ্ছেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এমএ কাশেম। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আর ‘বাংলা ব্যাংক’-এর আবেদন করেছেন বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি মালিকানায় ‘কোরিয়া-বাংলা’ ব্যাংক নামে আরেকটি ব্যাংকের আবেদন জমা পড়েছে। অন্যদিকে আরেকটি ব্যাংক একটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য দেয়া হবে। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ‘সমৃদ্ধির সোপান’ নামে আরেকটি ব্যাংক চালুর পরিকল্পনা রয়েছে খোদ সরকারের। বিশেষায়িত প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংককে বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, দেশের অর্থনীতির যে পরিসর, তাতে করে চলমান ব্যাংকগুলোই যথেষ্ট। নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, দেশের ৯৫ শতাংশ ব্যাংকারই চান না নতুন কোনো ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হোক। ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৫৫ শতাংশ। তবে ৯২ শতাংশ গ্রাহক ও ৭৫ শতাংশ ব্যাংকারই চান বর্তমানে কার্যরত ব্যাংকগুলোর নতুন শাখা চালু করা হোক। নতুন ব্যাংকের আগের অনুমোদন দেয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এতে বাজারে অহেতুক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়েছে। দেশে অধিক সংখ্যক ব্যাংক থাকলেও ব্যবসার কোনো প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে না। বিভিন্ন কারণে নতুন উদ্যোক্তা  তৈরি হচ্ছে না। তাই বর্তমানে বড় বড় কোম্পানি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় ব্যাংকের গ্রাহক। আবার ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও ব্যাংকগুলোর মালিকানা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। একেকটি গ্রুপ ৫ থেকে ৬টি ব্যাংকের বড় অংশের মালিক। দুুটি ব্যাংকের মালিক রয়েছেন এমন গ্রুপ নতুন ব্যাংকের জন্য আবার আবেদন করেছেন। এতে মনোপলি ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর পরও নতুন আরও কিছু ব্যাংকের লাইসেন্স নেয়ার তৎপরতা চলছে। এ েেত্র কাজ করছে রাজনৈতিক বিবেচনা। নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপরও নানামুখী চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলোর পে সরকারের ওপর মহলে নানা তদবির চলছে। এর মধ্যে একটি ব্যাংকের পে খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি পত্র পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া সরকারি খাতের বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনী নিজ নিজ মালিকানায় নতুন ব্যাংক চাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের প থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স চেয়ে ৮০টি আবেদন রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সমীায় বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির যে আকার তাতে এখন আর নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এ সমীাটি বাংলাদেশ ব্যাংক করেছিল ২০১০ সালে। যখন সরকার থেকে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ ছিল। ওই সমীার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই সময় স্পষ্ট করেই বলেছিল ‘দেশে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এখন আর কোনো নতুন ব্যাংক দেয়া হবে না।’ কিন্তু সে সময় অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। এখন নতুন নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন। সরকার চাচ্ছে নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত, এটি কীভাবে দেয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করা। এরপর সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে শুধু ২০১২ সালেই বেসরকারি খাতে ৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের লাইন্সেস দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে সীমান্ত রীবাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মালিকানায় সীমান্ত ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়। এই নিয়ে দেশে এখন ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ছয়টি, বিশেষায়িত দুটি ও বিদেশি ৯টি ব্যাংক রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে বিশেষায়িত গ্রামীণ, আনসার-ভিডিপি, কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যারা সীমিত আকারে ব্যাংক ও লিজিং ব্যবসা করছে। : বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, নতুন ৯টি ব্যাংক কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মাথায় বেশ কয়েকটি আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ভারে আক্রান্ত। রয়েছে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা। ফলে নতুন ব্যাংকগুলো বাজারে এসে মন্দের বোঝা আরও ভারী করেছে। তারা ব্যাংকিং খাতে নতুন কোনো প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করতে পারেনি বা নতুন কোনো সেবাও নিয়ে আসতে পরেনি। এ ছাড়া অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি ভালো চলছে। বাকিগুলো নানা সমস্যার ভারে জর্জরিত। : সব ব্যাংক অন্যায় ও অনিয়ম করলে তাদের ব্যবস্থা নেয়ার কথা যাদের- তারাও ম্যানেজ হয়েই আছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু হলমার্কের বেলায় যেভাবে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে, অন্য অনেক বড় বড় ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। : জানা গেছে, হলমার্ক আড়াই হাজার কোটি টাকা নিলেও এর চেয়ে অনেক বেশি টাকা নিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়েছে আবুল খায়ের গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপ। আবুল খায়ের গ্রুপ নিয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। আর এস আলম কেবল ইনল্যান্ড বিল পার্চেজ করেই নিয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য ঋণও নিয়েছে। : অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মহা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। এক ব্যাংক থেকে টাকা অন্য ব্যাংকে নেয়া হয়েছে। ঋণ নেয়া ব্যাংকের টাকা কাগজে-কলমে লেনদেন করে পরিশোধ দেখানো হলেও আবার ওই টাকা নতুন করে ঋণ দেয়া হচ্ছে। ফলে ব্যাংকের মূল টাকা চলে গেছে চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত গ্রুপ এস আলমের হাতে। : দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে যে অর্ধশতাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংক আছে তাকেই চাহিদার তুলনায় বেশি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। এ অবস্থায় নতুন ব্যাংকের অনুমোদন আসলেই কতটুকু প্রয়োজনীয় তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে তাদের মনে। : বিবিসি বাংলা গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘আরো তিনটি নতুন ব্যাংক, কতটা প্রয়োাজন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলেছে, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে কয়েক বছর আগে ছয়টি নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায় ওই ব্যাংকগুলোর অনুমোদন দেয়া নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকিং খাত নিয়ে যখন ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে সে সময়ে নতুন করে তিনটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত। : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এর আগে যখন নয়টি ব্যাংক দেয়া হয়েছিল তখন আমরা বলেছিলাম বাংলাদেশের অর্থনীতির যে আকার সেখান থেকে আর ব্যাংক দেয়াা ঠিক হবে না। : তিনি বলেন, এই নয়টি ব্যাংকের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক রয়ে গেছে। এনআরবি ব্যাংকসহ সমস্যাযুক্ত কিছু ব্যাংক আছে। এই রকম একটা পরিস্থিতিতে আবারো তিনটি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়াটা আমি যুক্তিযুক্ত মনে করি না। : তিনি বলেন, শুধু আমি না, আমরা যখন ব্যাংকিং খ্যাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কথা বলি তখন সকলেই একমত যে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের খুব খারাপ অবস্থা। : বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকের সংখ্যা না বাড়িয়ে বরং কমানো উচিত। যেসব ব্যাংক এসেছে সেগুলোর অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বর্তমানের ব্যাংকগুলোই বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না। নতুন ব্যাংক এলে অর্থনীতিতে একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার জন্ম দেবে। : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ছোট দেশে ব্যাংক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য মার্জার আইন করার কথা বলা হলেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কয়েকটি ব্যাংক মার্জার করলে একটি বড় প্রতিষ্ঠান করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠানের ইক্যুয়িটি বেশি থাকলে খরচ কম হয়। সে েেত্র তুলনামূলক কম সুদে ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হবে। : বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, সব সময় কিছু আবেদনপত্র জমা থাকে। তবে কয়টি ব্যাংক দেয়া হবে সেটি রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এ মুহূর্তে নতুন কোনো ব্যাংকের প্রয়োজন নেই বলে প্রতীয়মান হয়। : : : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

মির্জা ফখরুল ইসলাম পিলখানা হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। আপনিও কি তাই চান?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
33762 জন