আর্থিক খাতে সুখবর নেই
বিনিয়োগ নেই বাড়ছে বেকারত্ব ॥ ব্যবসা বাণিজ্যেও ধস নামছে ॥ লোকসানের মুখে রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো
Published : Saturday, 2 December, 2017 at 12:00 AM, Update: 01.12.2017 10:34:35 PM
দিনকাল রিপোর্ট : বর্তমানে দেশের আর্থিক খাতে কোনো সুখবর নেই। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান গুনছে। বৈদেশিক বিনিয়োগের অভাব, বেকারত্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে লুটপাটসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কেবল আমানতকারী বা ব্যবসায়ীরাই ব্যাংকবিমুখ হবে না, উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। : সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে। সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫টি মুনাফার দেখা পায়নি। আর্থিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, জানুয়ারিতে পরবর্তী আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তাতেও খুব বেশি সুখবর থাকার কথা নয়। : পরিচালনা পর্ষদের স্বেচ্ছাচারিতা, অব্যবস্থাপনার আর অদক্ষতার কারণে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে ব্যাংকিং খাতে। নানা অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি বাড়ছে এ খাতে মন্দ ঋণের পরিমাণ। এসব নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেষ তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) হিসাবে ৬টি প্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে। অপরদিকে নয় মাসের হিসাবে পরিচালন নগদ অর্থ সংকটে রয়েছে চারটি। আর একটি কোম্পানির সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। মুনাফায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পাঁচটির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) চেয়ারম্যান ও ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান ৭ শতাংশ সুদেই প্রচুর আমানত পাচ্ছে। কিন্তু অনেকে ১০ শতাংশের প্রস্তাব দিয়েও আমানত পাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান লোকসান করছে তাদের কস্ট অফ ফান্ড বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে এখন আমাদের সবাইকে সিঙ্গেল ডিজিটে লেন্ডিং করতে হচ্ছে। স্প্রেড চার শতাংশের মধ্যে থাকতে হবে। সে কারণে আমাদের লভ্যাংশ কমে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো এগ্রেসিভ ফাইন্যান্স করছে। ব্যাংকগুলো সাড়ে আট, নয় শতাংশ সুদে ফাইন্যান্স (ঋণ দেয়া) করছে। এখন ১৩ শতাংশে সুদে কেউ ঋণ নেবে না।’ : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, লিজিং কোম্পানিগুলো আমানত নিয়ে বসে থাকবে না, তাদের ঋণ দিতে হবে। এখন তাদের ঋণ বিতরণের চিত্রটা কি সেটা দেখতে হবে। আর আমানতকারীদের আস্থা না পেলে লিজিং কোম্পানিগুলো আমানত পাবে না। : জানা গেছে, ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক আমানত না পাওয়ায় প্রতিনিয়ত কলমানি মার্কেটে (আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার) ধরনা দিচ্ছে অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। মূলত ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ ধার করে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। তারল্য সংকটের কারণে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বড় গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে পারছে না। অনেক গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে আমানত ফেরত চাইলে চুক্তির চেয়ে বেশি মুনাফা দেয়ার কথা বলে তিন-চার মাস সময় নিচ্ছেন। আমানত সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মকর্তার মতে, অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া বেশিরভাগ কোম্পানিকে কলমানি মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি), ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স এবং ইউনিয়ন ক্যাপিটাল মোটা অংকের লোকসানে রয়েছে। : এর মধ্যে সব থেকে বেশি লোকসানে রয়েছে বিআইএফসি। চলতি বছরের নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে পাঁচ টাকা ৪৫ পয়সা। আর শেষ তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) লোকসান হয়েছে দুই টাকা। আগের বছরেও প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে ছিল। ২০১৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে বিআইএফসি শেয়ারপ্রতি লোকসান করে চার টাকা ৯০ পয়সা। : ইউনিয়ন ক্যাপিটালের পাশাপাশি নগদ অর্থ সংকটে পড়ার তালিকায় রয়েছেÑ লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, আইপিডিসি ফাইন্যান্স এবং জিএসপি ফাইন্যান্স। এর মধ্যে লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ছয় টাকা ১৫ পয়সা, আইপিডিসি ফাইন্যান্স এক টাকা ৯৪ পয়সা ও জিএসপি ফাইন্যান্স ৭০ পয়সা শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। : মুনাফায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেÑ ইসলামিক ফাইন্যান্স, মাইডাস ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল হাউজিং, আইপিডিসি ফাইন্যান্স এবং ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় কমেছে। : এদিকে শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে আরো কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের আশঙ্কা করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত এক প্রতিবেদন দেখা গেছে, নিয়মনীতি না মেনে ঋণ দেয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের আর্থিক খাতে। ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ গত ৯ বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। এর বাইরে আরো ৪৫ হাজার কোটি টাকার খারাপ ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ এখন এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ৪৮টি ব্যাংকের মধ্যে ১৩টির আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ। এই ১৩ ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বিশেষায়িত ব্যাংক ৮টি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দি ফারমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিস্থিতি কয়েক বছর ধরে খারাপ হচ্ছে। এমনকি দুই বছর ধরে এই ১৩ ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসিয়েও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। : এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ  বলেন, সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে অব্যবস্থাপনা চলছে। অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। এটি ব্যাংক খাত তো বটেই, সার্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। এমন অবস্থা চলতে থাকলে কেবল আমানতকারী বা ব্যবসায়ীরাই ব্যাংকবিমুখ হবেন না, উৎপাদন, বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখনই সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শক্ত হাতে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। : তাছাড়া সরকার ব্যাংকিং খাতে আইনের যে সংশোধন আনতে যাচ্ছে, সেখানে পরিবারতন্ত্র গুরুত্ব পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রস্তাবিত এ আইনে বলা হচ্ছে, যেকোনো বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে চারজন সদস্য পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন। : এই সংশোধিত আইন কার্যকর করা হলে পরিবারতন্ত্র কায়েমের মাধ্যমে পরিচালকদের লুটপাটের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তে একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। এটি হবে ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের পরিপন্থী। : রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘আন্তর্জাতিক ঋণ পরিসংখ্যান ২০১৮’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে বিনিয়োগ কমার মূল কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। প্রতিবেদনটি গত বুধবার ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত হয়। : প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে যেখানে বিনিয়োগ ছিল ২৪৩ কোটি ৭২ লাখ ডলার, ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে ১৭০ কোটি ৬৪ লাখ ডলারে। এক বছরের ব্যবধানে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে ৭৩ কোটি ৮ লাখ মার্কিন ডলার (৫ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা)। : এছাড়া প্রতিবেদনে অবকাঠামো খাতের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সেই সাথে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মন্ত্রণালয়গুলোর অদক্ষতা। এসব কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমছে বলে উল্লেখ করা হয়। : সম্প্রতি বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমার প্রধান কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এসব সূচকে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে।  : বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে বাংলাদেশে একজন বিনিয়োগকারীর যে সময় লাগে, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি বলে তিনি জানান। : বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ফোকাস’ শীর্ষক অপর এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি তিনটি। এগুলো হচ্ছেÑ আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার আরও অবনতি, রাজস্ব খাতের সংস্কারের অভাব ও আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। : এছাড়া বৈশ্বিক কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছু ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এগুলো হলোÑ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে নীতির অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। : অবকাঠামোগত উন্নতি এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি হলে বাংলাদেশ উৎপাদনশীল খাতকে আরও আকৃষ্ট করতে পারবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। পাশাপাশি রাজস্ব ও আর্থিক খাতে সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা অব্যাহত থাকলে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। :  





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ক্ষমতাসীনরা ব্যাংকিং খাতে হরিলুট চালাচ্ছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
11252 জন