৪৬ বছরেও সংরক্ষণ হয়নি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর
প্রশাসনের অবহেলায় অরক্ষিত!
Published : Sunday, 31 December, 2017 at 12:00 AM
আব্দুল কাদের, বদলগাছী (নওগাঁ) : নওগাঁর বদলগাছীতে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর ৪৬ বছর ধরে অরক্ষিত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন গ্রামবাসী। সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ভূমি ক্ষয় ও ভূমি ধসের কারণে অরক্ষিত গণকবরগুলো নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। গণকবরে শায়িত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা বদলগাছী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে থাকলেও শহীদদের গণকবর হেফাজত করার কেউ নেই। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রত্যক্ষদর্শী ডাঙ্গিসারা গ্রামের মো. আসতুর আলী (৭৫), লুৎফর রহমান (৭০), আব্দুস সামাদ ও ওসমান আলী জানান, ওই দিন দুপুরের পর একজন ব্যক্তি ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় নদী পাড় হয়ে ডাঙ্গিসারা গ্রামে এসে গ্রামবাসীর সাহায্য চান এবং তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ওই মুক্তিযোদ্ধা আরো বলেন, তারা ছিলেন মোট ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা। সবার বাড়ি নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায়। বেঁচে যাওয়া ওই মুক্তিযোদ্ধা আরো জানান, ৯ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে তারা ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যান। কারণ তারা ৩ জন ছিলেন ভারতের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। আর ওই ৩ জন প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে আরো ৬ জনকে সঙ্গে নিয়ে বদলগাছীর উপর দিয়ে ভারতে যাওয়ার পথে ওই দিন সকালে বদলগাছীর বালুভরা ইউপির মির্জাপুর মোড়ে তাদের মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করে কতিপয় রাজাকাররা। আটকের পর পাক হানাদার বাহিনীর কাছে তাদের হন্তান্তর করলে নির্মম নির্যাতনের এক পর্যায়ে আধাইপুর ইউপির সেনপাড়া গ্রামের জঙ্গলে সারিবদ্ধভাবে তাদের চোখ বেঁধে ৯ মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৩ মুক্তিযোদ্ধা গুলির শব্দ পেয়ে তারা চিৎ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার কৌশল করে প্রাণে বেঁচে যান। আর বাকি ৬ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বেঁচে যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা হাতের বাঁধন খুলে ওই দিন দুপুরের পর ছোট যমুনা নদী পার হয়ে ডাঙ্গিসারা গ্রামে গিয়ে ওঠেন। এ সময় তিনি দেখতে পান তার আরো একজন সঙ্গী ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় উদ্ধার হয়ে নদীতে এসে পানি খাচ্ছেন। বেগতিক অবস্থার মধ্যে স্থানীয় লোকজন ওই ২ জন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে নিজ গ্রামে পাঠিয়ে দেন। বেঁচে যাওয়া ৩ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা নিজ গতিতে প্রাণে বেঁচে ফিরে যান তার নিজ বাড়িতে। বাকি ৬ জন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে ছুটে আসেন তাদের স্বজনরা ডাঙ্গিসারা গ্রামে। স্বজনরা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় নিহত ৬ মুক্তিযোদ্ধার ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে এনে ডাঙ্গিসারা গ্রামে ছোট যমুনা নদীর ধারে গণকবর দেন। বর্তমান উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার এনামুল হক বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবরসহ মুসলমানদের কবরস্থান হিসেবে ডাঙ্গিসাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দীনেশ সিংহের বাবা রামজনক সিংহ সাড়ে ১৬ শতক জমি কবরস্থানের নামে রেকর্ড করে দিয়েছেন। তিনি আরো জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর সংরক্ষণ ও বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের জন্য বহুবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় এমপির কাছে ধরনা দেয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগী ৬ যোদ্ধার প্রাণ কেড়ে নিল পাক হানাদার বাহিনী। সেই ৬ আত্মত্যাগী শহীদ মুক্তিযোদ্ধার গণকবর অরিক্ষত অবস্থায় ভূমি ক্ষয় ও ভূমি ধসের কারণে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। ডাঙ্গিসারা গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শীসহ গ্রামবাসী জানান, তারা নিজ হাতে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সেবা দিয়েছেন এবং যে ৬ জন মারা গেছেন তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে কবরস্থ করেছেন। স্বজনরা মান্দা উপজেলা থেকে এসে এখানে মিলাদ মাহফিলও করেছেন। ৬ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হলেনÑ নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার ময়নম ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের মৃত করিম সোনারের ছেলে কাদের বক্স, মৃত কাওছার আলী মন্ডলের ছেলে শাকায়েত মন্ডল, মৃত মকা আকন্দের ছেলে ইয়াজ উদ্দীন আকন্দ, মৃত লইম উদ্দীন মন্ডলের ছেলে লুৎফর রহমান মন্ডল, প্রসাদপুর ইউনিয়নের মৃত শশি মন্ডলের ছেলে মোহাম্মদ আলী খোকা, গণেশপুর ইউনিয়নের মৃত মাদার উদ্দীনের ছেলে রিয়াজ উদ্দীন এবং  প্রাণে বেঁচে যাওয়া ৩ জন হলেনÑ নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার ময়নম ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের মৃত মীর মোল্লার ছেলে মো. নজরুল মোল্লা, মৃত কলিমুদ্দীন মন্ডলের ছেলে নিকবর মন্ডল, মৃত খয়রুল মন্ডলের ছেলে গছির উদ্দীন মন্ডল। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। : :





দেশের পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আবারও বিতর্কিত নির্বাচন হলে দেশ বিপর্যয়ে পড়বে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
7201 জন