সংবিধান সংশোধনের ম্যান্ডেট সরকারের নেই : ড. কামাল
Published : Sunday, 31 December, 2017 at 12:00 AM
সংবিধান সংশোধনের ম্যান্ডেট সরকারের নেই : ড. কামালদিনকাল রিপোর্ট : সংবিধানে হাত দেয়ার আইনগত কোনো এখতিয়ার বা ক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকারী ও সিনিয়র আইনজীবী ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, সরকার চালানোর ব্যাপারেও তাদের সীমাবদ্ধতা আছে।  সেটা স্মরণ রাখতে হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করার বিষয়ে তারা নিজেরাই বলেছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আমরা এটা করছি। দ্রুত আমরা নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন দেব। এরপর তারা সাড়ে তিন বছর চালিয়েছে, যা সরাসরি অসাংবিধানিক। সুতরাং, তাদের বৈধতার প্রশ্ন প্রথমেই এসে যায়। তাই প্রশ্ন ওঠে, সংবিধানে হাত দেয়ার তারা কে? জনগণ তাদের ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি। : ড. কামাল হোসেন বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষায় সমাজের অন্যদের ভূমিকা ও করণীয় সম্পর্কে  আইনজীবী, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। : এদিকে ২০১৭ সালের পুরো বছরই ছিল সরগরম। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে শুধু রাজনীতিবিদ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং নানা শ্রেণি ও পেশার লোকজনের মাঝে ছিল নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষ। কারণ উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে দেশের নিম্ন আদালতে সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। শুধু তাই নয়, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহাকে চাপ প্রয়োগ করে টানা ৪০ দিনের ছুটিতে যেতে বাধ্য করা এবং ছুটিতে বিদেশে অবস্থানকালে চাকরি থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করার বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই অসহযোগিতার ফলে প্রধান বিচারপতি চাকরির ৮৪ দিন মেয়াদ থাকতেই অবসরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।  এখনো প্রধান বিচারপতির শূন্য পদে নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়নি। তবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা দায়িত্ব পালন করছেন। : এদিকে এসব আলোচিত বিষয় নিয়ে সংবিধান প্রণয়নকারী ড. কামাল হোসেন সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করার বিষয়ে তারা নিজেরাই বলেছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আমরা এটা করছি। দ্রুত আমরা নিয়মতান্ত্রিক নির্বাচন দেব। এরপর তারা সাড়ে তিন বছর চালিয়েছে, যা সরাসরি অসাংবিধানিক।  জনগণ তাদের ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি এবং তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে কে? : ড. কামাল হোসেন  প্রথমেই বলেন, বর্তমান সরকার ২০১১ সালে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী করেছিল। আর সেখানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দেয়া হলো। ওই সংশোধনীতে পরিষ্কার ফুটে উঠল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য যত রকম উপায় ছিল, সরকার তাই করবে। ওই রকম আকাক্সক্ষা থেকেই পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নেয়া হলো। ওই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মনোভাব থেকেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে মুক্ত করেছিল। অথচ ওই ব্যবস্থা ছিল জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জন। এমনকি সেই অর্জনে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরই বিরাট ত্যাগ-তিতিক্ষার ইতিহাস রয়েছে। পরিহাস হলো, ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পরেও আওয়ামী লীগ এক-এগারোতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল। এ বিষয়ে তাদের শয়ে শয়ে বিবৃতি পাওয়া যাবে। : ড. কামাল হোসেন বলেন, আমি তো একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির (এ বি এম খায়রুল হক) ব্যক্তিগত ভূমিকার দিকেই বিশেষভাবে নজর দিতে বলব। তার একক ভূমিকার কারণে মনে হয়েছে সরকার যেভাবে চেয়েছে, তিনি সেভাবে বিষয়টি হাজির করতে অভাবনীয় একটা ভূমিকা পালন করেছেন। জনগণের অসামান্য অর্জনকে জলাঞ্জলি দিতে তাকে আমরা কতগুলো খোঁড়া যুক্তি ব্যবহার করতে দেখেছিলাম। : ড. কামাল হোসেন বলেন, রিভিউ কী করে হতে পারে? আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এবং নয়জন অ্যামিকাস কিউরি সর্বসম্মতভাবে যে সিদ্ধান্তে এসেছেন, তা বদলে  দেয়ার আশা করা সংগত বলে বিবেচ্য হতে পারে কী করে? আওয়ামী লীগ নাকি এ জন্য নির্দিষ্টভাবে ৯৬টি কারণ দেখিয়েছেন। : ড. কামাল হোসেন বলেন, এতগুলো কারণ দেখানো স্বাভাবিক নয়। এর যারা মুসাবিদা করেছেন অনেকেই কিন্তু তাদের বিচারবুদ্ধির সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। সাধারণত আপিল বিভাগের রায়ে দু-একটি বড় গ্রাউন্ডস থাকতে হয়, যাতে রিভিউর জন্য শুনানির অপরিহার্যতা সহজেই প্রতীয়মান হয়। এতগুলো গ্রাউন্ডস দেখিয়ে কোনো দিন রিভিউ হয় নাকি? আমার ৫৮ বছরের পেশাগত জীবনে এমনটা কখনো শুনেছি বলেও তো মনে পড়ে না। : ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সাত বিচারপতির সিদ্ধান্ত নেয়াটা তো ভুল ছিল না। সেই সাথে নয়জন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অভিমতও ছিল। শুধু রিভিউ যারা লিখেছেন, তারাই বিভ্রান্ত। মনে হয় তারাই যেন শুধু সংবিধানের প্রকৃত মৌলিক কাঠামো অনুধাবন করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পুরো পর্যবেক্ষণ এক্সপাঞ্জসহ গোটা রায়টাই বাতিল চেয়েছে। তারা এটা করতে পারেন না। : ড. কামাল হোসেন বলেন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য শৃঙ্খলাবিধি অবশেষে সরকার প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে অগ্রহণযোগ্য কাজ হয়েছে। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে, নিম্ন আদালতের বিচারকদের ওপর সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ কেবল সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত থাকবে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের কাছে তা ন্যস্ত থাকার বিধান আমরা তো সেই ঐতিহাসিক পরম্পরা রক্ষা করে যুক্ত করেছিলাম। এখন তাতে এত অরুচি কেন! তিনি বলেন, ১৯২১-২২ সালের দিকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে আমাদেরই মৌলভি এ  কে ফজলুল হক, একজন তরুণ বিধায়ক হিসেবে সরকার থেকে বিচার বিভাগ পৃথক্করণের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। ফজলুল হক তৎকালীন শাসকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, তোমরা নিজেদের বেলায় বিচার বিভাগ আলাদা করো, আর আমাদের বেলায় নিয়ন্ত্রণ করো, তোমরা মোনাফেক। এরপর আমরা তা চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনকালীন একুশ দফায় যুক্ত করেছিলাম। : ড. কামাল হোসেন বলেন, রাষ্ট্র বিচারক অপসারণ সংক্রান্ত ৯৬ অনুচ্ছেদ প্রশ্নে সামরিক ফরমান অবৈধ বিবেচনায় বাহাত্তরে ফিরছে। আবার ১১৬ অনুচ্ছেদে চতুর্থ ও পঞ্চম সংশোধনীতে আনা পরিবর্তন দুটোই আঁকড়ে ধরছে। যদি বিদ্যমান ১১৬ অনুচ্ছেদটিই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, তাহলে সেটা কীভাবে যাচাই করা হলো? মানদন্ড কী, সেটাও তো বলতে হবে। : ড. কামাল হোসেন বলেন, শুধু প্রধান বিচারপতি সিনহা লেখেননি, এর আগে আপিল বিভাগের আরও তিনটি রায়ে বলা আছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সার্থক করতে বাহাত্তরের ১১৬ অনুচ্ছেদে ফিরতে হবে। : ড. কামাল হোসেন বলেন, প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য রাখার বিষয়টি খুবই অনাকাক্সিক্ষত। এভাবে তো চলতেই পারে না। অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য রাখা যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজে অভাবনীয়। একজন প্রধান বিচারপতি সংবিধানের আওতায় যত ধরনের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করতে পারেন, সেটা একজন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির পারার কথা নয়। : ড. কামাল হোসেন বলেন, প্রধান বিচারপতির পদ খালি রেখেই আগামী ২ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট দিবস পালন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটা তো হতে পারে না। সংবিধানে হাত দেয়ার আগে বঙ্গবন্ধু প্রথমেই সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়েছিলেন। আমরা দ্রুত মনস্থির করেছিলাম যে, উচ্চ আদালত সব সময় ক্রিয়াশীল থাকবেন, এখানে তো কোনো শূন্যতা রাখা যাবে না। যত দূর মনে পড়ে, হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত আদেশটাই ছিল প্রথম বা একেবারে শুরুর দিকের আইন। : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আবারও বিতর্কিত নির্বাচন হলে দেশ বিপর্যয়ে পড়বে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
7228 জন