দ্রব্যমূল্যে নাভিশ্বাসের বছর
Published : Sunday, 31 December, 2017 at 12:00 AM, Update: 30.12.2017 11:03:02 PM
দ্রব্যমূল্যে নাভিশ্বাসের বছরবাবুল খন্দকার, দিনকাল : বিদায় নিচ্ছে ২০১৭ সাল। বিদায়ী বছরে নিম্নবিত্ত ও সাধারণ মানুষের জন্য ছিল আতঙ্কের বছর। কখনো সাধারণ মানুষকে কাঁদিয়েছে মরিচের ঝাল। কখনো পেঁয়াজের ঝাঁজ। সারা বছরই সাধারণ মানুষকে ভুগিয়েছে চালের দাম। এছাড়া মাছ, মাংস, তেল, তরিতরকারি, ফলমূল, চিনি আর লবণসহ সবকিছুই আগের তুলনায় দাম কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে চাকরিজীবী আর খেটে খাওয়া মানুষের নাভিশ্বাস লক্ষ করা গেছে বছরজুড়ে। ২০১৭ সালে দ্রব্যমূল্যের প্রভাবে দেশে বেড়েছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। চলতি বছরে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারণে ৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে বলে জানিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম। : অবস্থা অনেকটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে শহর থেকে গ্রামে, নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী থেকে শুরু করে দিনহাজিরা শ্রমিক সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় করতে না পারায় নিম্ন আয়ের অনেকেরই এখন তিন বেলা খাবার জোটানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম কমানোর ওয়াদা দিয়ে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলেও দফায় দফায় বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের আমলের তুলনায় দ্রব্যমূল্যের দাম পাঁচ থেকে দশ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ভোটের আগে ১০ টাকা সের চাল খাওয়ানোর কথা বলে আওয়ামী সরকার জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। খরচ বাড়ছে জীবনযাপনের সব ক্ষেত্রেই। সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বারবার বাড়ানোর ফলে সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে সব ধরনের পারিবারিক ব্যয়ে, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে চালসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় গরিব মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। একটি পরিবারের স্থিরব্যয় যথা বাসাভাড়া, সন্তানের শিক্ষার খরচ, পরিবহন ব্যয়, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি এমনকি গৃহকর্মীর জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হয়। এখন স্থির ব্যয়ও অস্থির। মাছ, মাংস, সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিনি, তেল এমনকি লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিসের দাম হু হু করে বেড়েই চলেছে। ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী ও ১৪টি সেবার মান নিয়ে বিশ্নেষণে (ক্যাব) দেখা যায়, শুধু রাজধানীতেই গেল কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৭১ শতাংশ। এক মাস আগে রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের দাম ছিল ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায়। একই অবস্থা আমদানি করা পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও। পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৬২ শতাংশ এবং আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৭১ শতাংশ। শুধু মাসের হিসাবে নয় বছরের হিসাবেও দেশি ও আমদানি করা উভয় ধরনের পেঁয়াজের দাম বেড়েছে বহুগুণ। এক বছর আগে দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। আর আমদানি করা পেঁয়াজের কেজি ছিল ২০ থেকে ২৮ টাকা। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে দেশি : শুধু পেঁয়াজ নয় বর্তমানে প্রতিটি নিত্যপণ্যের বাজারদর বেশ চড়া। চিকন চাল ৬০ টাকার নিচে মিলছে না। গরিবের মোটা চালের দাম ৫০ টাকার ওপর। আদার কেজি ১৬০ টাকা। কাঁচামরিচও ১৫০ টাকার নিচে মিলছে না। আর যেকোনো ধরনের সবজির কেজি ৪০ টাকার ওপরে। : ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, দ্রব্যের দাম বাড়ায় মানুষ অনেক কষ্টে আছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনধারণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। একটি পণ্যের দাম বাড়লে সমস্যা নেই। সেটা হতেই পারে। কিন্তু এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি। সঞ্চয় তো করতেই পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় খরচও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে জীবনযাত্রার ব্যয় মিটিয়ে মানুষের বেঁচে থাকা দায় হয়ে পড়বে। : জনগণের প্রতি সরকারের উদাসীনতার কারণেই দ্রব্যমূল্য হু হু করে বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা। বর্তমান আওয়ামী সরকার যেহেতু জনগণের ভোট ছাড়াই ক্ষমতা দখল করেছে তাই জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণ হিসেবে কৃষিবিদ মেহেদি হাসান পলাশ দিনকালকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাট ও নেতাকর্মীদের লাগামহীন চাঁদাবাজির কারণে কৃষক পাচ্ছে না তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাজারে গিয়ে গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। সরকারি দলের ব্যবসায়ীরা একচেটিয়া অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। : বেসরকারি একটি বীমা কোম্পানিতে অফিসার পদে কাজ করেন মো. আজিজুর রহমান। তিনি জানান, পরিবারসহ দুই সন্তান নিয়ে মানিকনগরের একটি ভাড়া বাসায় তার বসবাস। দুই সন্তানই স্কুলে পড়ে। বড় ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে আর ছোট মেয়ে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। : তিনি বলেন, ‘সারা মাসে যে আয় করি সংসার চালাতেই সব খরচ হয়ে যায়। মাস শেষে কোনো টাকা জমা থাকে না। আর গত কয়েক মাস ধরে যে হারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়েছে তাতে ঠিকমতো সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, গত মাসে এক সহকর্মীর কাছ থেকে টাকা ধার করে সংসার চালাতে হয়েছে।’ : আট হাজার টাকা বেতনে একটি গার্মেন্টে কাজ করেন ফাতেমা বেগম। স্বামীও গার্মেন্টকর্মী। দুজনে মিলে মাসে আয় করেন প্রায় ২০ হাজার টাকা। দুই সন্তান নিয়ে বাড্ডার একটি ভাড়াবাড়িতে থাকেন। ফাতেমা বলেন, প্রতি মাসে বাসাভাড়া দিতে হয় আট হাজার টাকা। দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে স্কুলে পড়ে। দুজন যা আয় করি তা দিয়ে সংসার খরচ, সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালাতে হয়। এর বাইরে গ্রামের শ্বশুর-শাশুড়ি ও এক ননদ আছেন। প্রতি মাসে তাদেরও টাকা দিতে হয়। : তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে গ্রামে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পাঠাতাম। কিন্তু গত মাসে টাকার অভাবে দুই হাজার টাকা পাঠিয়েছি। তাতে শ্বশুর-শাশুড়ির মন কিছুটা খারাপ। তারা মনে করেন, আমরা অনেক টাকা আয় করি। কিন্তু কীভাবে তাদের বোঝাব, ঢাকায় থাকার কত খরচ!’ : শুধু আজিজুর কিংবা ফাতেমা বেগম নয়, রাজধানীতে বসবাস করা একটি বড় অংশের জীবনযাত্রার চিত্র এটি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক কর্মজীবী দুপুরে ভাত খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। গত এক মাসে রাজধানীতে বসবাস করা বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার কমপক্ষে ৫০ জনের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। : :  





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আবারও বিতর্কিত নির্বাচন হলে দেশ বিপর্যয়ে পড়বে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
7240 জন