নির্যাতনের শিকার বিএনপি
বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ লাখো নেতাকর্মী সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক মামলায় জর্জরিত
Published : Monday, 1 January, 2018 at 12:00 AM, Update: 31.12.2017 10:39:57 PM
রফিক মৃধা, দিনকাল : ২০১৭ সালে পুরো বছরজুড়ে দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ মামলার মুখোমুখি ছিল পুরো বিএনপি। দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত নেতা-কর্মীরা ছিল বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত। মিথ্যা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মামলা ছাড়াও গুম-খুনের শিকার হয়েছেন দলের বহু নেতাকর্মী। ৭৮ হাজার মামলায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে বিএনপির প্রায় ৮ লাখ নেতাকর্মী। মামলায় বাদ নেই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতাই। গত ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলীয় পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ মামলার সংখ্যা ৭৮ হাজার ৩২৩টি, তাতে আসামির সংখ্যা ৭ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৮ জন। এসব মামলায় হাজিরা দেয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাদের বছরজুড়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে আদালতে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সপ্তাহে তিনদিন হাজিরা দিচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী  বেগম খালেদা জিয়া। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ ৩৬টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিলেও লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তার আইনজীবীরা বলছেন, বেআইনিভাবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন লন্ডন থেকে এসেই আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেন। বছরের শেষদিকে এসে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৫ কার্যদিবস আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। : মামলার তোড়েই বছর পার করেছে বিএনপি : বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ৭৬টি, মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে ৮৮টি, রুহুল কবির রিজভীর বিরুদ্ধে ৪৪টি মামলা রয়েছে। মামলার তোড়েই বছর পার করেছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের একই পরিস্থিতি। সপ্তাহের বেশির ভাগ দিন তাদের গন্তব্য আদালত। অসংখ্য মামলায় হাজিরাকে কেন্দ্র করে বছরের বেশির ভাগ সময় কেটেছে আদালতের বারান্দায়। বিগত বছরগুলোতে দায়েরকৃত মামলাগুলোর বেশির ভাগ চার্জশিট হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বেশকিছু মামলার। ফলে নির্ধারিত দিনে হাজির না হলেই জারি হচ্ছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াই পড়েছেন মামলার তোড়ে। বিএনপির নেতারা মামলাগুলোকে ‘মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করে বলেন, বিরোধী দলকে দমন করতে সরকার মিথ্যা মামলাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। : বছরের শুরুতে কর্মসূচি পালনে অনুমতি পায়নি বিএনপি : বছরের শুরুতে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলই মুখোমুখি পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়ায়। ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে ‘কালো পতাকা মিছিলের’ কর্মসূচি দেয় বিএনপি। এ উপলক্ষে সমাবেশ করতে চেয়ে অনুমতি না পেয়ে সারাদেশে বিক্ষোভের ডাক দেয় বিএনপি। : নতুন ইসিতে বিএনপির আপত্তি : রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যেমে ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচন কমিশন ঘোষণা হলে তাতে আপত্তি জানায় বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিবর্তে ‘প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে’ বলে অভিযোগ আনা হয় জোটের পক্ষ থেকে। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না বলেও মত প্রকাশ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অক্টোবর মাসে ইসির সঙ্গে সংলাপে ২০ দফা প্রস্তাব দেয় বিএনপি। সেই সঙ্গে ইসিকে তাগিদ দেয় সাংবিধানিক ক্ষমতা চর্চার। : কুসিকে নির্বাচনে বিএনপির জয় : কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে মার্চে মেয়র পদে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু বিজয়ী হন। এই জয়ে বিএনপির আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগে। নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মনিরুল হক পান ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা পান ৫৭ হাজার ৭৬৩ ভোট। : বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর ও উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা : বছরের মাঝামিাঝিতে হাঁটু ও চোখের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বিএনপি চেয়ারপারসন  বেগম খালেদা জিয়া, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সপরিবারে আছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যািন তার বড় ছেলে তারেক রহমান। গত ১৫ জুলাই লন্ডন গিয়ে প্রায় তিন মাস সেখানে অবস্থান শেষে ১৮ অক্টোবর দেশে ফেরেন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপি নেত্রীর লন্ডন সফর নেতাকর্মীদের মাঝে বাড়তি উন্মাদনা সৃষ্টি করে। লন্ডনে থাকা অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তার দেশে ফেরা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক খবর রটে। বিষয়টি বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে সাময়িকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও দলীয় প্রধানের দেশে ফেরায় তারা আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হন। বিএনপি নেত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে বিমানবন্দরে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী জমায়েতের মাধ্যমে এর প্রমাণ রাখেন। : বছরের মাঝামাঝিতে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ চমক : বছরের মাঝাঝিতে এসে গত ১০ মে বিএনপির ভিশন-২০৩০ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। তার এই ভিশন রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরনে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে দাবি করে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার কথা বলেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ক্ষমতায় এলে কালাকানুনগুলো বাতিল, বিচার বিভাগ ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি, পুলিশকে আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের সঠিক তালিকা করা, দেশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের কাতারে তুলতে পদক্ষেপ নেয়া, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ ভাগ ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি, তথ্য-প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত করা, বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল, বেকার ভাতা দেয়া, বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু করার প্রতিশ্রুতি, ব্রহ্মপুত্র সেতু; বুড়িগঙ্গা, গোমতী ও কর্ণফুলী নদীর ওপর নতুন সেতু তৈরি, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেস হাইওয়ে, সারাদেশে বিভিন্ন মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়ন, সার্কভুক্ত ও আশিয়ান দেশসমূহের সাথে রেল ও সড়ক যোগাযোগের উদ্যোন গ্রহণ এবং গণচীনের ‘ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ উদ্যোগের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন বেগম খালেদা জিয়া তার ওই ভিশনে। : ৪১ পাতার বইয়ের এই ভিশন-২০৩০ রূপকল্পে বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, জাতি গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধার, পরিসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতি, গবেষণা ও উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ, জনমিতিক লভ্যাংত, শিক্ষা ও মানবসম্পদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, বিদেশে কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ, মিডিয়া ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, কৃষি ও কৃষকের জন্য পদক্ষেপ, শ্রমিক কল্যাণ, নগরায়ণ ও আবাসন, নিরাপদ খাদ্য ও ওষুধ নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন, যুব, শিশু ও নারীদের জন্যও কর্মসূচি, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ, পানি সম্পদ, অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ, পর্যটন, সম্পদ সংরক্ষণ, সামাজিক ব্যাধির সমস্যা, ভূমিকম্প, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অনগ্রসর অঞ্চলের জন্য পদক্ষেপ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এই ৩৭টি বিষয়ের ওপর ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার কথা জানান বিএনপি প্রধান।    : তছনছ বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয় : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপির ভিশন-২০৩০ তুলে ধরার দশদিন পর গত ২০ মে তার কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। ‘রাষ্ট্র বিরোধী ও আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থি নাশকতা সামগ্রীর খোঁজে’ পুলিশ গুলশানে বিএনপি নেত্রীর কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে। অফিসটি ‘তছনছ করা’ হয়েছে অভিযোগ করে তখন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘অভিযানে পুলিশের প্রাপ্তি শূন্য। অর্থাৎ তারা কিছুই পায়নি। পুলিশও এটি স্বীকার করেছে। তাহলে কেন এই অভিযান? কার্যালয়ে রাষ্ট্রবিরোধী তথ্য আছে বলে এক ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযানের সময়ে পুরো কার্যালয় কাগজপত্র তছনছ করে দেয়া হয়েছে। পুলিশ অনুমতি ছাড়াই কার্যালয়ে প্রধান ফটকের গেটের তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করে। অফিসের ভেতরে থাকা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি টিভি) ভেঙে ফেলা হয়। : ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ : বছরের শেষ দিকে ২২ অক্টোবর বাংলাদেশ সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বৈঠকে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত প্রতিবেশী বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এবং সব দলের অংশগ্রহণ দেখতে চায় বলে জানান সুষমা স্বরাজ। রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ওই বৈঠকের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। আগামী নির্বাচন সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং এ বিষয়ে যেসব সমস্যা রয়েছে তা তুলে ধরেছেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সমস্যাগুলো শুনেছেন।’ : রোহিঙ্গাদের প্রতি মহমর্মিতা জানাতে উখিয়ায় বেগম খালেদা জিয়া : লন্ডন থেকে দেশে ফিরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কক্সবাজারের উখিয়া যান রোহিঙ্গাদের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে, যারা মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে শরণার্থী হিসেবে রয়েছেন। গত ২৮ অক্টোবর উখিয়ার উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা দেন খালেদা জিয়া। মাঝে চট্টগ্রামে যাত্রা বিরতি দিয়ে ৩০ অক্টোবর কক্সবাজারের উখিয়া যান বিএনপি নেত্রী। সঙ্গে নিয়ে যান ৪৫ ট্রাক খাদ্যপণ্য। উখিয়া যাওয়ার দিন খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা হয়। এতে বহরে থাকা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যামের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। উখিয়ায় রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিয়ে ফেরার পথেও গাড়ি বহরে হামলা হয়। ওই সময়ে রাস্তায় দাঁড়ানো দুটি পাবলিক গাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এজন্য সরকারকে দায়ী করে বিএনপি। : উখিয়া সফরে নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ততায় মুগ্ধ বিএনপি নেতারা : নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দর কষাকষিকে সামনে রেখে বেগম খালেদা জিয়ার ওই উখিয়া সফরে বেশ ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ দেখায় স্থানীয় জনগণ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা, যা বিএনপিকে আত্মবিশ্বাসের রসদ দিয়েছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। তারা বলেছেন, উখিয়া সফর মানবিক হলেও সেখানে যাত্রাপথে মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ততার প্রকাশ ঘটেছে, সেটি অভূতপূর্ব। পরে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি দেশের মিয়ানমার সীমান্তে শুরু হয় উত্তেজনা। লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয়ের দাবিতে মুখরিত হয় বিএনপি। সেই সঙ্গে শুরু করে কূটনৈতিক তৎপরতা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য দেশ ছাড়াও ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে দেশগুলোর প্রধানের কাছে একটি চিঠি পাঠান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। সে চিঠিতে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবায় দলের তরফে গঠন করা হয় ত্রাণ টিম ও মেডিকেল ক্যাম্প। বেগম খালেদা জিয়া নিজেই রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে উখিয়া সফর করেন। বিএনপির মেডিকেল ক্যাম্প চালু রেখে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। শিগগিরই দেশের বিভিন্ন স্থানের দলীয় প্রধানের সফরের রাজনৈতিক কর্মসূচি আসবে। উখিয়া সফরে ‘জনপ্রিয়তার প্রমাণ’ পরবর্তী সফরের আগে প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই সফরগুলোতেও জনগণের এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকলে সরকারের কাছে এক ধরনের মেসেজ পৌঁছে যাবে। : বছরের শেষে দীর্ঘদিন পর মাঠে বিএনপি : দীর্ঘদিন ঘরোয়া রাজনীতিতে সীমিত থাকা বিএনপি বছরের শেষ দিকে এসে সমাবেশের মতো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার সুযোগ পায়। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গত ১২ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে বিএনপি। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি ডিঙিয়ে ঢাকায় বিএনপির জনসভায় নেতাকর্মীদের ‘ব্যাপক স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত’ আর উচ্ছ্বাসের চিত্র নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে দলটিকে। সমাবেশে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাড়া এসেছে দাবি করে দলটির নীতি নির্ধারকরা বলছেন, এটি সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের এক ধরনের প্রতিবাদ। : নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়ে অনড় বিএনপি : নিরপেক্ষ সরকারের বিষয়ে অনড় বিএনপি। সরকারের তরফে বারবার নাকচের পরও আগামী একাদশ নির্বাচন সুষ্ঠু করতে আলোচনার তাগিদ দিয়ে গেছে বিএনপি। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য ও দলীয় কর্মসূচির মধ্যে ফুটে উঠেছে নির্বাচনমুখী মনোভাব। সরকারকে চাপের মধ্যে রেখে তুলনামূলক অনুকূল পরিস্থিতি পেলেই নির্বাচনে যাওয়ার মনোভাব পোষণ করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। দলটির এ মনোভাব ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে সর্বমহলে। : বিএনপি চেয়ারপারসন ও মহাসচিবের ওপর হামলা : ২০১৭ সালে কয়েক দফায় হামলার শিকার হয় বিএনপি চেয়ারপারসন ও মহাসচিবের গাড়িবহর। জুন মাসে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রথম কবর জিয়ারত করতে গিয়ে রাঙ্গুনিয়ায় সরকার সমর্থকদের হামলার শিকার হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহর। তিনি নিজেও আহত হন। অন্যদিকে নভেম্বর ২৯ ও ১ ডিসেম্বর ফেনীতে সরকার সমর্থকদের হামলায় শিকার হয় বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহর। : জনইস্যুতে বিএনপির কর্মসূচি : ২০১৭ সালে জনস্বার্থ ইস্যুতে কয়েকটি কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মার্চে দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিল দলটি। ২০১৭ সালের ২০ মে হঠাৎ করে বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। এ নিয়ে রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত হলেও বড় কোনো কর্মসূচি দেয়নি দলটি। আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে এ বছর দুইবার তৃণমূলে বার্তা দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার রায় ও রায় পরবর্তী তাকে নিয়ে সরকারের পদক্ষেপের ব্যাপারে প্রথম থেকেই মুখর ছিল বিএনপি। ২০১৭ সালের মধ্যভাগে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এ সময় ত্রাণ কমিটি গঠনের মাধ্যমে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে বিএনপি। বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে হাওরকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। : সাংগঠনিক পুনর্গঠনে মনোযোগ দেয় বিএনপি : ২০১৭ সালের প্রথমদিকেই সাংগঠনিক পুনর্গঠনে মনোযোগ দেয় বিএনপি। দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙ্গা করতে গঠন করা হয় ৫১টি টিম। দলকে তৃণমূলে শক্তিশালী করতে নতুন সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। ১ জুলাই কর্মসূচিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। অন্যদিকে ১৮ জানুয়ারি সাইফুল আলম নিরব ও সুলতানা সালাউদ্দিন টুকুর নেতৃত্বে গঠন করা হয় যুবদলের নতুন কমিটি। : আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান : বছরের একেবারে শেষদিকে এসে রাজধানীতে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের এক সমাবেশে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠায় কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়ে নেতাকর্মীদের আন্দোলন-সংগ্রাম ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। : বিএনপি যাদের হারিয়েছে : ২০১৭ সালে দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে হারিয়েছে বিএনপি। মৃত্যুবরণ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস, স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার, ভাইস চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান মুন্নু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন, জোটের শরিক দল জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছোটভাই আহমেদ কামাল প্রমুখ। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বহু তৃণমূল নেতাকর্মী। : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

সুজন নেতৃবৃন্দ বলেছেন, রংপুরের ভোট নিয়ে ইসির নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিচার করা ঠিক হবে না। আপনি কি একমত?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
7439 জন