অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই কাম্য
Published : Tuesday, 2 January, 2018 at 12:00 AM, Update: 01.01.2018 11:04:56 PM
আবুল কাশেম, দিনকাল : অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই কাম্যনানা আশাবাদ ও শঙ্কা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বছর। আর এই নতুন বছরে বিশিষ্টজনদের প্রত্যাশা আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে সকল দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। তারা বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে একতরফা ভোটারবিহীন নির্বাচনে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার অনেক বিতর্কিত। সরকারের গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ, এটা আর বলার অবকাশ রাখে না। শুধু তাই নয়, সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের ফলে আগামী নির্বাচনে সবদলের অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনও প্রায় অনিশ্চিত। বড় দুইদলের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা কমিয়ে আনতে না পারলে দেশে একটি ভাল নির্বাচনের আশা করা যাবে না। দেশের স্বার্থেই সবদলের অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রয়োজন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন দেশের বিশিষ্টজন। বিশিষ্টজনদের বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো : : আকবর আলি খান : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক আমলা আকবর আলি খান ২০১৮ সালকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, সামনে অনেক ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে সরকারকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরে দেশে সংঘাতের রাজনীতি বিরাজ করছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দুটি দলই দায়ী। বর্তমানের সরকার বিএনপিকে রাজনৈতিক কার্যক্রম করতে দিচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়েছে। এটা গণতন্ত্রের কোনো লক্ষণ নয়। যদিও আদালত বলেছেন এই সরকার বৈধ এবং আদালতের আদেশ আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু নৈতিকভাবে এটা সরকারের একটা বড় পরাজয়। : তিনি বলেন, আমার মনে হয় সরকার এটা বুঝতে পেরেছে এবং সরকার চাচ্ছে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। আর বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে বর্তমানে খুব খারাপ অবস্থায় আছে। বাংলাদেশে বিরোধী দল হওয়ার কথা বিএনপির, জাতীয় পার্টির নয়। কিন্তু  জাতীয় পার্টি বর্তমানে বিরোধী দলের আসনে বসে আছে। বিএনপি অনেক সুযোগ-সুবিধা হারাচ্ছে এবং তাদের অসুবিধা হচ্ছে। সুতরাং বিএনপি সম্ভবত কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও কমপক্ষে বিরোধী দলের আসন পাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত হবে। এই দুটিই হলো আশার লক্ষণ। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত কী হবে, এটা  শেষ মুহূর্ত ছাড়া বলা যাবে না। সরকার বিরোধী দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দিলেই নির্বাচন হবে। এটা নিশ্চিতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। নির্বাচনের বছর কিন্তু রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন নেই বলে নির্বাচন হবে কি না বা হলে কেমন নির্বাচন হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।  আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার, সুশাসনের অনেক ঘাটতি রয়েছে। মানবাধিকার আগে পরে অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তিনি বলেন, প্রথমত মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংস্থার লোকজন এসবের সঙ্গে জড়িত। এটা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। এ ছাড়া শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন মহল বিভিন্ন ক্ষেত্রে  যেসব তৎপরতা চালাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনই বিঘিœত হচ্ছে তা নয়, তাদের নিজেদের মধ্যেও খুনখারাবি হচ্ছে। সরকারের পক্ষে এগুলো বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সুতরাং মানবাধিকার পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়, এই পরিস্থিতির অবশ্যই উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। : তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা  অনেক ক্ষেত্রেই নেই। সরকারের সমালোচনা করে  ফেসবুকে বা অন্যত্র লেখালেখি করলে তাদের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা হচ্ছে।  এটা খুবই খারাপ লক্ষণ। এর একটি উপাদান হলো, আইনের অপব্যবহার করা হচ্ছে।  সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেই লোকজন গুম হচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ আমরা সংবাদপত্রে দেখতে পাচ্ছি। এটাও আরেকটা উদ্বেগের কারণ।  : ব্রি. জেনারেল (অব) সাখাওয়াত : সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ২০১৮ সালে দেশে একটি ভালো জাতীয় নির্বাচন হবে এটা দেশবাসীরও আকাক্সক্ষা। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকার কিছু কিছু কাজ করেছে। নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছে। একটি বড় সমস্যা আমাদের এখনো রয়ে গেছে, তা হচ্ছে গণতন্ত্রে উত্তরণের সঠিক পথটি এখনো খুঁজে পাইনি। তারা রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ভালোমতো করেছে। কিন্তু তাতেও নির্বাচনি ব্যবস্থা ও ভোট নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসেনি। : ২০১৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে ভোটের ওপর যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, গত চার বছরেও তা আর ফিরে আসেনি। উৎসবমুখর ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান বা ভোটের সংস্কৃতি  দেশে এখন আর নেই।  নতুন বছর শুরুতে আমাদের প্রশাসন এখনো সরকার দিয়ে প্রভাবিত অবস্থায় আছে। তাদের নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ হতে হবে। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ দেখছি না। : নির্বাচনের সময় পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সব সময় তাদের ওপর নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করে থাকে। নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীকে কীভাবে নিরাপত্তা পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, তা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। : নির্বাচনকে ঘিরে আরেকটি বড় সমস্যা আমাদের আছে। তা হচ্ছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে দূরত্ব এখনো রয়ে গেছে। তাদের মধ্যে দূরত্ব না কমলে একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া কঠিন হবে।  দেশ এখনো দ্বিদলীয় ধারায় বিভক্ত। অনেক রাজনৈতিক দল আছে, তারা জোট বেঁধে নির্বাচন ও রাজনীতি করে। ফলে ২০১৮-এর নির্বাচনের আগে ওই দুই দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম পর্যায়ের হলেও সমঝোতা তৈরি হতে হবে। : বদিউল আলম মজুমদার : সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক দিনকালকে বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আবার ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন হলে দেশে বিপর্যয় নেমে আসবে। সংকট আরো ঘনীভূত হবে। ২০১৪ সালে  ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় বর্তমান সরকার অনেক বিতর্কিত। তিনি বলেন, আমরা (সুজন) রংপুরের নির্বাচনে আশাবাদী হলেও পরে ১২৭টি এলাকায় স্থানীয় নির্বাচনে যে  বিশৃঙ্খলা ও হানাহানির দৃশ্য দেখলাম, তাতে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শংকিত। : তিনি বলেন, আশা করতে চাই বড় দুইটি দলের দূরত্ব কমিয়ে  এনে দেশে সবদলের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের স্বার্থেই সবদলের অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রয়োজন । : মতিউর রহমান : চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে নতুন বছরের সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার নানা দিক নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশ নেন সংবাদপত্র জগতের সিনিয়র দুই সম্পাদক। : ওই অনুষ্ঠানের নিয়মিত উপস্থাপক দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর উপস্থাপনায় বক্তব্য রাখেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক মতিউর রহমান। : মতিউর রহমান বলেন, আমরা আশাবাদী হতে চাই। তবে ভাল হতো প্রধান দুই দলের মধ্যে ন্যূনতম সমঝোতার মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতির একটা পরিবর্তন অপেক্ষা করছে দেশবাসী। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ২০১৪ সালের মতো একদলীয় ও ভোটারবিহীন নির্বাচন হলে দেশের জন্য মঙ্গল হবে না। : তিনি নতুন এই বছর মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। : তিনি বলেন, সংবাদপত্রে আমরা অনেক সময় চাপের মাঝে ও ভয়ে থাকি। সব কথা সব সময় বলতে পারি না। তিনি বলেন, গত বছরের ভুল ত্রুটি, ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে যেন সহনশীল একটা সমাজ তৈরি হয়। নতুন বছর যেন সত্যিকার অর্থে একটা ভালো নির্বাচনের দিকে যেতে পারি। রাজনৈতিকভাবে উন্মুক্ত পরিবেশ  তৈরি হয়। আর সংবাদপত্র হিসেবে আরেকটু উন্মুক্ত হয়ে সাহসের সঙ্গে  যেন আমাদের কাজগুলো করতে পারি।  সেটা দেশের স্বার্থে ও মানুষের স্বার্থে করতে চাই। : মতিউর রহমান বলেন, সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেয়া, সতর্ক করা, পাশে থেকে সাহায্য করার ক্ষেত্রেও সংবাদপত্রের কাজ করার আছে বলে তিনি মন্তব্য  করেন। প্রায় আধা ঘণ্টার এই আলোচনায় আরো উঠে আসে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যকার বিরোধ, রাজনৈতিক পরিবেশ, রোহিঙ্গা সঙ্কটসহ নানা প্রসঙ্গ। : :  





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, ৫ জানুয়ারির মতো বিতর্কিত নির্বাচন হলে দেশে বিপর্যয় নেমে আসবে। আপনিও কি একমত?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
34701 জন