রাজনৈতিক ব্যবহারে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে
Published : Tuesday, 9 January, 2018 at 12:00 AM, Update: 08.01.2018 11:20:07 PM
রাজনৈতিক ব্যবহারে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমছেআবদুল্লাহ জেয়াদ, দিনকাল : দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব প্রধানত পুলিশ বাহিনীর ওপর ন্যস্ত। অনেক ভাল কাজ করলেও দুঃখজনকভাবে ঘুষ আর চাঁদাবাজির তকমার নিচে ঢাকা পড়ে যায় পুলিশের কৃতিত্ব। সাম্প্রতিককালে থানাহাজতে আসামির মৃত্যু, ঝুলিয়ে নির্যাতন, ধর্ষণ বা রিমান্ডের নামে অযাচিত নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে কাজ করে। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দেশের পুলিশ অনেক আগে থেকেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন আরও বেশি হচ্ছে। কিছু পুলিশ সদস্যের ন্যক্কারজনক আচরণ দেখে দিন দিন আস্থা হারাচ্ছে জনগণ। পুলিশকে ঘিরে মাঝেমধ্যেই ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’ বা ‘সর্ষের ভেতরে ভূত’ টাইপের শিরোনামে খবর দেখা যায়। পুলিশের ভালো কাজের প্রশংসার খবর একেবারে দেখা যায় না, এমনও নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে পুলিশের গৌরবময় অবদানের কথা আমরা কমবেশি জানি। জাতিসংঘ মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তারপরও সার্বিকভাবে পুলিশের প্রতি অধিকাংশ সাধারণ মানুষের রয়েছে নেতিবাচক মনোভাব। বিপদের বন্ধুর কাছে গিয়ে আরো বিপদে পড়ার ভয় অনেকের মধ্যে। অনাকাক্সিক্ষত বর্তমান এ অবস্থার পেছনে রয়েছে নানাবিধ কারণ। ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আমরা পুলিশকে বর্তমান অবস্থায় আসতে উৎসাহিত করেছি। অনেকটা বাধ্য করা হয়েছে, বলা যায়। ব্যক্তি হিসেবে একজন পুলিশের দোষের চেয়ে পদ্ধতিগত বা রাজনৈতিক জটিলতা ও রাজনীতিবিদদের আদর্শিক দৈন্যের জন্যই প্রধানত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে । : বাংলাদেশের প্রধান বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ। স্বাধীনতার পর সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত পুলিশ বাহিনীর কলেবর বেড়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেড়েছে কাজের পরিধিও। তবে দেশের জনগণের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় পুলিশের সংখ্যার অনুপাত অনেক অনুন্নত দেশের থেকেও কম। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে রয়েছে আস্থার ঘাটতি। : নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ১০-১৫ বছর আগের পুলিশের তুলনায় বর্তমান পুলিশ অনেক বেশি প্রশিক্ষণের সুবিধা পাচ্ছে। সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাহিনীটিতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, রিক্রুটমেন্ট ও মামলার তদন্ত ফরমেট রয়ে গেছে আগের মতোই। তাছাড়া পুলিশের নামে গুম ও অপহরণের ঘটনাও বেড়েছে। জনগণের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট আরও বেড়েছে। সামনে এসব কাটিয়ে ওঠাই প্রধান চ্যালেঞ্জ পুলিশের। : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ১০ লাখ এবং নারী ৮ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার। আর পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা ২ লাখ ৯ হাজার ৭৫ জন। : পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, জনসংখ্যার তুলনায় লোকবল কম হলেও আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে পুলিশ। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পেশাগত দায়িত্ব পালনে পুলিশ বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, পুলিশে জনবল বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরাপত্তায় সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশের অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে। বিশেষায়িত ইউনিট গঠন, দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগের তুলনায় অধিক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। : আইজিপি বলেন, জঙ্গি তৎপরতা দমনে পুলিশ বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও অভিযানের কারণে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে গেছে। জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। আগের তুলনায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রদানে পুলিশের ভূমিকা প্রশংসা পেয়েছে। : তবে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পুলিশ বাহিনী সদস্যদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। বাড়ছে জনগণে আস্থাহীনতা। সামনের দিনগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বাইরে থেকে পুলিশের সর্বজনীন ভাবমূর্তি রক্ষা ও আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। কাজকর্মে পুলিশের আরও শক্ত চেইন অব কমান্ড জরুরি। : পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা একটি অনলাইন পোর্টালকে বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধ বা মামলার মানদন্ডই পুলিশকে মূল্যায়নের একমাত্র নির্দেশিকা নয়। দেশের মানুষ জঙ্গিবাদ গ্রহণ করেনি। যে কারণে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সফলতা আসছে। কিন্তু মাদকের ক্ষেত্রে পুলিশ সফল নয়। এ জন্য জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি। দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতি ঠেকাতে মাদক নিয়ন্ত্রণ জরুরি। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান নিয়মিত রাখতে হবে।’ : তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার কাছে পুলিশের কাজকর্মে চেইন অব কমান্ডটা আরও শক্ত হওয়া জরুরি মনে করছি। তাদের কিছু কিছু জায়গায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে কাজ করা উচিত তা করছে না। অনেক ক্ষেত্রেই পেশাবহির্ভূত কাজ করছে। সেগুলো বন্ধ করার জন্য তত্ত্বাবধান পর্যায়ের খুব দৃঢ় ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বাহী কর্তৃপক্ষ ও যারা তত্ত্বাবধান করেন তাদেরকেই কঠোর হতে হবে।’ : সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘পুলিশ একটা ইনস্টিটিউশন। যেখানে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও ভরসার জায়গা। মানুষ থানায় যাবে, কর্মকর্তাদের কাছে যাবে। ভাল আচরণ প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। সব প্রতিষ্ঠানের চ্যালেঞ্জ আছে। কিছু দুর্বলতাও আছে। সেখানে পুলিশ কতখানি পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করবে? পুলিশ একা সব করতে পারবে না। পুলিশ বিচ্ছিন্ন কোনো সংস্থা নয়। পুলিশকে সফল করতে সবারই সহযোগিতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দরকার। এখানে আস্থা অর্জনের বিষয়টিও জরুরি। রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। এটাই হবে সামনের দিনগুলো পুলিশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক ব্যবহার থেকে বাঁচতে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা মাঠ পুলিশকে নির্দেশনা দেবেন। অভয় দেবেন। কোনো মন্ত্রী, এমপি, স্থানীয় নেতা কে কী বলল সেটা বড় বিষয় নয়, আইনের মধ্যে থেকে পুলিশকে যা করার কথা তাই করবে। তাহলে রাজনৈতিক ব্যবহার করে যাবে।’ : সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘১০ বছর আগের পুলিশের তুলনায় এখনকার পুলিশ বেশ দক্ষ। উচ্চ থেকে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। এরপরও আমি মনে করি, পেশাগত কর্মদক্ষতায় বিশেষায়িত জায়গায় এখনো পুলিশ আগের জায়গায় রয়ে গেছে।’ : তিনি আরও বলেন, অনেক জায়গায় পুলিশের উন্নতি দরকার। এখনও ইনভেস্টিগেশন আগের ফরমেটে হচ্ছে। তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের যথেষ্ট দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। তদন্ত সুষ্ঠু না হওয়ায় অনেক মামলা টিকছে না। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের দেশের পুলিশ অনেক আগে থেকেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এখন আরও বেশি হচ্ছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে পুলিশ বেরিয়ে আসতে পারেনি। : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা বলেছেন, রাজনৈতিক ব্যবহারের কারণে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে। আপনি কি একমত?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
14307 জন