আজ সেই কলঙ্কিত ১/১১
Published : Thursday, 11 January, 2018 at 12:00 AM, Update: 10.01.2018 10:44:23 PM
আলী মামুদ, দিনকাল : আজ সেই আলোচিত সমালোচিত কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেন (বা ১/১১)। বিগত ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সংঘটিত জাতীয় জীবনের অদ্ভূত ঘটনাকে অনেকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফসল হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে ছিল বিদেশী ইন্ধনও। সেদিন রাতে খোদ রাজধানীতে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল। সেসব কাহিনী জাতীয় গণমাধ্যমসহ বিশ্বমিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেনের বার্ষিকী উপলে বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়। রাজধানীর তোপখানা রোডের মোড়ে প্রকাশ্য দিবালোকে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তা বের মধ্যে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর চারদলীয় জোট সরকার তার মেয়াদান্তে মতা হস্তান্তর করে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ড. ইয়াজউদ্দিন আহমদ তার মতার অতিরিক্ত হিসেবে সংবিধানের সর্বশেষ বিকল্প (অপশন) মোতাবেক প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় মহাজোটের দাবির প্রেেিত একাধিকবার তফসিল পরিবর্তন করে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়। উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর রহস্যজনক ও নাটকীয়ভাবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ৩ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে তাদের মহাজোটের সকল প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আহবান জানান। এতে নির্বাচন অনুষ্ঠান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মহলও ব্যাপকভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এমনি এক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মইন উ. আহমদের প্রত্য চাপে প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমদ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং নিজে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। জরুরি অবস্থা জারির প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে এক লিখিত ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘উপদেষ্টা পরিষদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিগত আড়াই মাসে দেশে হানাহানি, সন্ত্রাস ও রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসহিষ্ণু ও হিংসাত্মক আচরণের ফলে ঝরে গেছে অনেক মূল্যবান নিষ্পাপ প্রাণ, দেশের অর্থনীতি হয়েছে বিপর্যন্ত। সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়েছে সহিংসতা যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে বলে আমার বিশ্বাস। ... দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হলে, দেশের রফতানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে হলে, দেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এবং দেশের উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।’   : ১/১১-এর ধারাবাহিকতা : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সে দিনকে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে অভিহিত করে থাকেন। পরদিন ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গবর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিলেন তা আজো পরিষ্কার হয়নি। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী মইনউদ্দীন-ফখরুদ্দীন সরকার প্রথম দিকে জনসমর্থন পেলেও কিংস পার্টি গঠন, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলাসহ বেশ কিছু কারণে দেশে-বিদেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের কথা থাকলেও ওয়ান-ইলেভেনের সরকার সংবিধান উপো করে প্রায় দু’বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে। ঐ সরকারই বহু ঘটনা-দুর্ঘটনার পর অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে। ‘সাজানো’ সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট অবিশ্বাস্য নিরংকুশ বিজয় অর্জন করে। সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী শক্তির পরিকল্পনা অনুযায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের পরাজয় নিশ্চিত করা হয়। সেই নির্বাচনের ফল ধরেই মহাজোট ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করে। : ১/১১-এর সরকারের ধারাবাহিকতা। : প্রকৃত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায়, ১/১১-এর ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। এ কারণেই ১/১১-এর কুশীলবরা এখনো বহাল তবিয়তে। মইন উ আহমদের মতার বেনিফিসিয়ারি তার পরিবারও। তার বড় ভাইয়ের ব্যবসার ইফাদ গ্রুপ কানেকশনের কথাও শোনা যায়। সেই ব্যবসায়ে যে মইনের ভাগ রয়েছে তা আর বলার অপো রাখে না। : তৎকালীন সাভার ক্যান্টনমেন্টের জিওসি ও গুরুতর অপরাধ দমন অভিযানের প্রধান হিসেবে জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে রাষ্ট্রদূতের চাকরি শেষে এখন ঢাকায় বসেই ব্যবসায়ে মন দিয়েছেন। নতুন ‘ধারার রেস্টুরেন্ট’ চালাচ্ছেন। : ১/১১ এর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মেজর জেনারেল (অব) এম এ মতিন বিশেষ প্রভাবশালী ছিলেন। তার ভাষায় চুনোপুঁটি নয় রুই কাতলা নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন। ব্রিগেডিয়ার ফজলুল বারী ও মেজর জেনারেল এটিএম আমিনও মতার ছড়ি ঘুরিয়েছেন। তখন জমি ও ফাট দখলও করেছেন বলে শোনা যায়। বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে টাকা জমা নিয়েছেন। সেই সব টাকা এখনো বুঝে পাননি বলে অনেকেই দুঃখ করেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়াল মিন্টুও এই প্রতিবেদকের কাছে একদা জানান যে, তার কাছ থেকে যে টাকা জমা নেয়া হয়েছে তা এখনো ব্যাংকে আছে। তা ছাড় করা হয়নি। : এরশাদ-মইন একই পথের পথিক : অবৈধ মতা দখলে সেনা প্রধান এইচ এম এরশাদ ও মইন উ আহমদÑউভয়ই আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছিলেন। আর এই সমর্থন ছিল স্বয়ং দলীয় প্রধানের প থেকে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গভবনে চড়াও হয়েছিলেন মইন উ আহমদ। মতলব ছিল সামরিক শাসন জারির। কিন্তু ঢাকাস্থ একজন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সে খবর জেনে নিয়ে বাগড়া দেন। শেষ পর্যন্ত জরুরি আইন জারি করে আর্মি ব্যাকও সরকার কায়েম হয়। অনেকটা একই স্টাইলে সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে বঙ্গভবন থেকে তাড়িয়ে দিয়ে মসনদে বসে পড়েন। এরশাদের মতা দখলে বিবিসির সাাৎকারে আই এ্যাম নট আন-হ্যাপি আর মইন উ আহমদের ‘জরুরি সরকার’ তথা ফখরুদ্দীন আহমদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বঙ্গভবনে সহাস্যে উপস্থিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ। তখনকার সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ওই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি আমন্ত্রণ পেয়েও। : উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে কতিপয় সেনার গুলিতে নিহত হন দেশের জনপ্রিয় ও দ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে ‘উই রিভোল্ট’ বলে তিনিই প্রথম বিদ্রোহ করেন। শুধু তাই নয় তিনি তার অনুসারী (প্রায় ৩০০) সেনাদের নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রয়োজনে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। কারণ তখন ঐ ধরনের একটি ঘোষণার প্রয়োজন ছিলÑ যে কারণে তা দেশী-বিদেশী রেডিওতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার বিএনপি প্রার্থী হিসেবে এক কোটি ভোটের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু ’৭১-এর পাক বাহিনীর দালাল (কলেবরেটর) এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ মতা দখল করেন। একইভাবে দেশের সাংবিধানিক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে গায়ের জোরে সরিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করে একটি সরকার কায়েম করেন। শারীরিকভাবে দুর্বল অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে দিয়ে মইন চক্র অনেক কিছুই করিয়ে নেন বলে প্রকাশ। : ১/১১ খ্যাত সরকার বা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারটি ছিল অবৈধভাবে গঠিত। তখনকার সংবিধানের যে (৫৮ ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই সরকার গঠিত হয় তা যথাযথভাবে পালিত হয়নি। ঐ অনুচ্ছেদের ৪র্থ অপশন অনুযায়ী বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে একজন নাগরিককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা যাবে। তবে এ জন্য প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু তা করা হয়নি। যার প্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা তার কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি। যদিও সেদিন (১২.০১.২০০৭) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঐ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা যোগ দেবেন বলে প্রচার করা হয়েছিল বঙ্গভবন থেকেই। কিন্তু তিনি সঙ্গত কারণেই তাতে যোগ দেননি। তবে আওয়ামী লীগ ও তার অনুসারী দলের নেতৃবৃন্দকে বঙ্গভবনে ভিড় করতে দেখা গিয়েছিল। : ১৫ বছরের জন্য আসা ২ বছরেই বিদায় : ১/১১-এর সরকার সম্পর্কে বিশিষ্ট আইনজীবী সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগের অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার এ প্রসঙ্গে জানান যে, তখন তাকে সেনা অফিসাররা নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেন। তখন তারা বলছিলেন যে, তারা ১৫ বছরের জন্য এসেছেন। সহসা মতা ছাড়া হবে না। শেষ পর্যন্ত ২ বছরের মধ্যে তাদের বিদায় নিতে হয়। : তবে তৈমূর আলম খন্দকারকে গ্রেফতার কাহিনী ছিল আলাদা। তিনি বিআরটিসির চেয়ারম্যান ছিলেন। আর বিআরটিসি বাসের যোগানদাতা ছিলেন তৎকালীন সেনা প্রধান মইন উ আহমদের বড় ভাই (ইফাদ খ্যাত) ইফতেখার আহমদ, বিআরটিসি কানেকশনেই জনাব তৈমূরকে গ্রেফতার করা হয়, তবে আইনগতভাবে তাকে আটকে রাখা যায়নি বলে জনাব তৈমূর সম্প্রতি এ প্রতিবেদককে জানান। :  কানেকশন প্রতিবেশী দেশের : তবে ১/১১ এর কুশীলবদের ইন্ধন দিয়েছিল নিকট প্রতিবেশী দেশের তৎকালীন সরকার। মইন উ আহমদ সেই দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরে দেখা করতে গেলে তিনি মইনকে অভয় দেন যে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সরকার এলেও তার কোনো ভয় নেই। বাস্তবেও হয়েছে তাই। : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, খালেদা জিয়াকে হয়রানি করতেই তাঁর বিরুদ্ধে ১৪ মামলা স্থানান্তর করা হয়েছে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
34010 জন