ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের চার বছরে অস্থির ব্যাংকিং খাত
Published : Saturday, 13 January, 2018 at 12:00 AM
আবদুল্লাহ জেয়াদ, দিনকাল : শুধু সরকারি নয়, জনপ্রিয় বেসরকারি ব্যাংকিং খাতও ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের চার বছরে অস্থিরতার মধ্যে বিরাজ করছে।  আর ঘটেছে একের পর এক অস্বাভাবিক বড় বড় কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বদলের মাধ্যমে দখল করা হচ্ছে বেসরকারি ব্যাংক। রিজার্ভ চুরি, গভর্নরের পদত্যাগ, রেমিটেন্স প্রবাহে নেতিবাচক ধারাÑ গত চার বছরে ব্যাংকিং খাতে ছিল আলোচনার শীর্ষে। এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলোর নাজুক অবস্থা, ব্যর্থতার অভিযোগে ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, একাধিক ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক, সোনালী, জনতা সব ব্যাংকেরই নড়বড়ে অবস্থাও রয়েছে আলোচনায়। বিনিয়োগ মন্দায় তলানিতে আমানতের সুদহার। লাগামহীনভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। আর এসব কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে আর্থিক খাত। ফলে শঙ্কায় আমানতকারীরা। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল কম্পিটিভনেস রিপোর্ট ২০১৭-১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অস্থিরতার চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সরকারি ব্যাংক খাত মৃতপ্রায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ তদারকির অভাবে ব্যাংকিং খাত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এতদিন সরকারি ব্যাংকের অবস্থা ভয়াবহ খারাপ থাকলেও এখন তা বেসরকারি ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া নতুন কয়েকটি ব্যাংকের টিকে থাকাটাই মুশকিল হয়ে গেছে। ভালো চলছিল বেসরকারি ব্যাংক খাত। কিন্তু সরকারি হস্তক্ষেপে এই বেসরকারি ব্যাংক খাতও অস্থির হয়ে পড়েছে। এছাড়া ব্যাংক খাতের শীর্ষব্যক্তিদের মতে, যে পদ্ধতিতে ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তাতে গ্রাহকদের আস্থা হারিয়ে যাবে। পর্ষদ সদস্যদের স্বেচ্ছাচারিতা, অব্যবস্থাপনা আর অদক্ষতার কারণে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে এ খাতে। অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে খেলাপি ঋণ অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকও নিশ্চুপ। ফলে এ খাতে অস্থিরতা বেড়েছে। : সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। ব্যবসা- বাণিজ্যে মন্দায় বিনিয়োগ চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিটি ব্যাংকের বাড়ে অলস অর্থ। সংকটে পড়ে ব্যাংক খাত। পরিচালন ব্যয় কমাতে আমানত সংগ্রহে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। কমাতে থাকে আমানতের সুদহার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। চার বছরের তা দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকায়। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যখন আমানতের সুদহার ৮ শতাংশের বেশি ছিল, তখন আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল এখনকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০১৪ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে। ২০১৫ সালে ব্যাংক আমানতে ১৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১৬ সালে তা দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশে। আর ২০১৭ সালের জুনে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ। : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি মিলে ব্যাংকের সংখ্যা ৫৭টি। এর মধ্যে বেশিরভাগ ব্যাংকের অবস্থাই খারাপ। ঘটেছে একের পর এক অস্বাভাবিক বড় বড় কেলেঙ্কারি। এর মধ্যে সোনালী ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি ইত্যাদি। সম্প্রতি সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এর আগে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের ঘটনা ব্যাংকিং খাতকে চিন্তায় ফেলেছে। সর্বশেষ এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিবর্তনেও বেশ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও আস্থাহীনতা ও চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। এছাড়া নতুন করে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া ব্যাংকগুলোতে পরিচালনা পর্ষদে রদবদলের কারণে অর্থ হরিলুটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ফলে গোটা ব্যাংকিং খাতের প্রতিই আমানতকারীর আস্থা নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। : গত বছরের শুরুতেই দখল হয় বেসরকারি খাতের অন্যতম ইসলামী ব্যাংক। জামায়াতমুক্ত করতেই ব্যাংকটির পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তনে আনে ক্ষমতাসীনরা। গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং অক্টোবরে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে (এসআইবিএল) পরিবর্তন আসে। তিনটি ব্যাংকেই শেয়ার কিনে মালিকানায় এসেছে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ। এদিকে গত বছরের ৩০ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংকের কায়দায় পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হয় বেসরকারি খাতের সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে (এসআইবিএল)। এ পরিবর্তনেও জড়িত ছিল এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টরা। : এ বিষয়ে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, নদী ও চর দখলের মতোই একের পর এক ব্যাংক দখল হচ্ছে, যার কোনো বিচার নেই। ফলে তৈরি হচ্ছে অসমতা। বাড়ছে বৈষম্য। তিনি আরও বলেন, টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হলেও সে জন্য যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার তার ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে। : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়েই আছে। আপনি কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
33911 জন