দম্ভ বাদ দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন : ফখরুল
Published : Sunday, 14 January, 2018 at 12:00 AM, Update: 13.01.2018 11:49:41 PM
দম্ভ বাদ দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন : ফখরুলদিনকাল রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত শুক্রবার সন্ধ্যায় দেয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণকে ‘খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, প্রশানমন্ত্রীর ভাষণ জাতিকে হতাশ, বিস্ময়-বিমূঢ় এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই ভাষণে বিদ্যমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আত্মদাম্ভিকতা পরিহার করে দেশের স্বার্থে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।  তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করে তুলেছে। ‘সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার’ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে সেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। একটি সুন্দর পরিবেশে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলে জাতির মনে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমরা আস্থা রাখতে চাই। : গতকাল শনিবার বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। : মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন।  তার ভাষণ জাতিকে হতাশ, বিস্ময়-বিমূঢ় এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই ভাষণে বিদ্যমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ, এবং বিভ্রান্তিকর। জাতি আশা করেছিল তার প্রধানমন্ত্রিত্বের এই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর আগেই তিনি যে ভাষণ দেবেন সে ভাষণে থাকবে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা, জাতীয় সংকট নিরসনে একটি স্পষ্ট রূপরেখা এবং জনগণের উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য থাকবে বিভ্রান্তির বেড়াজালমুক্ত কর্ম পদক্ষেপ। পাকিস্তানের স্বৈরসামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তার শাসনের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উন্নয়ন দশক (উবপধফব ড়ভ উবাবষড়ঢ়সবহঃ) পালন করেছিলেন। গণতন্ত্রহীন তথাকথিত উন্নয়ন জনগণ গ্রহণ করেনি। পরিণতিতে তার মতো লৌহমানবকে ক্ষমতা থেকে সব পাকিস্তানব্যাপী গণঅভ্যুত্থানের মুখে বিদায় নিতে হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ‘উন্নয়নমেলা’ করছে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস পাকিস্তানি আমলের স্বৈরশাসক ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য যে ধরনের চমকের আশ্রয় নিয়েছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে। এ দেশের সচেতন জনগণ সবকিছু জানে ও বোঝে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের কোনো মন্তব্য বাহুল্যই হবে মাত্র। : তিনি আরো বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে তার শাসনামলে উন্নয়নের এক চোখ ধাঁধানো বয়ান পেশ করেছেন। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের দাবির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও একমত হতে পারেনি। জানুয়ারি/২০১৭-এর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশের বেশি  হবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী দাবি করেছিলেন এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে হবে না। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। অথচ সরকার এ অর্থবছরে ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। এভাবে প্রায় প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত সরকারি প্রাক্কলেনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো দ্বিমত পোষণ করে আসছে। আমাদের প্রশ্ন হলো, জনগণ কোন তথ্য বিশ্বাস করবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের একটি সহসম্পর্ক থাকার কথা। কিন্তু আমদানি-রফতানি, বৈদেশিক রেমিটেন্স, ঋণ প্রবাহ প্রভৃতির সঙ্গে সরকারের প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রাক্কলনের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিসংখ্যানের তেলেসমাতি করে সরকার বরাবরই জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রীও তাই করলেন। : বিএনপির এই নেতা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়ে গিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ৩.১ শতাংশ হলেও ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ১.৮ শতাংশে নেমে আসে, যা অর্থনীতিতে সুযোগের সমতা নিশ্চিতকরণ ও সুবিধাবঞ্চিতদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রবৃদ্ধির ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির হার ও নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।  ২০১৭ সালের মে মাস থেকে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। গড় সাধারণ মূল্যস্ফীতি অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৫.৫৯ শতাংশ হয়। এদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বৃদ্ধি পেয়ে অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৬.৮৯ শতাংশে উন্নীত হয় যদিও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বর মাসের ৩.৮১ শতাংশ থেকে কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৩.৬৫ শতাংশ হয়। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন হ্রাস, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার প্রবণতা ও কর্মসংস্থানের অভাব, একদিকে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মানের ওপর প্রতিকূল প্রভাব সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির সম্মুখীন করছে। ইতিমধ্যে দেশে ২০১০ সালের ২৩১৮ কিলোক্যালরি থেকে ২০১৬ সালে গড় মাথাপিছু দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ পাঁচ শতাংশ কমে ২২১০ কিলোক্যালরিতে নেমে আসে। : উদ্বেগ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আয়-বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আয়-বৈষম্য হ্রাস না পেলে সাধারণ জনগণ উন্নয়নের সুফল পায় না, দারিদ্র্য হ্রাস পায় না, বেকারত্ব পরিস্থিতির উন্নতি হয় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পাঁচ বছর অন্তর অন্তর খানা আয়-ব্যয় জরিপ চালায়। এই জরিপ থেকে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে অনুপুঙ্খ (ফবঃধরষবফ) বিবরণ পাওয়া যায়। ২০০৫, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে গৃহস্থালির প্রকৃত আয় ভোগমূল্য সূচকের নিরিখে দাঁড়িয়েছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ২০৩ টাকা, ৮ হাজার ১৩০ টাকা এবং ৭ হাজর ২৫২ টাকা। একইভাবে প্রকৃত ভোগের পরিমাণ গৃহস্থালি প্রতি ছিল যথাক্রমে ৫ হাজার ৯৬৪ টাকা, ৭ হাজার ৯৯২ টাকা এবং ৭ হাজার ১৪ টাকা। স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, ২০১০-এর তুলনায় ২০১৬-তে জনগণের জীবনমান নিম্নমুখী হয়েছে। ২০০৫ সালে ক্যালরি অর্থাৎ পুষ্টি গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৩৯, ২০১০-এ ২ হাজার ৩১৮ এবং ২০১৬-তে ২ হাজার ২১০। ক্যালরি গ্রহণের দিক থেকেও ২০১০ এর তুলনায় ২০১৬-তে ক্যালরি গ্রহণ নিম্নমুখী হয়েছে। ২০১০-এর তুলনায় গৃহস্থালির প্রকৃত আয় ২০১৬-তে ১১ শতাংশ কমে গেছে। ২০১০ এর তুলনায় ব্যক্তি প্রতি মাথাপিছু প্রকৃত আয় ২০১৬-তে ২ শতাংশ কমেছে এবং প্রকৃত ভোগব্যয় কমেছে ১ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জীবনমানের অবনতি ঘটেছে। আয় বৈষম্য বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদরা ‘গিনি সূচক’ ব্যবহার করেন। ২০১০ সালে সবচেয়ে দরিদ্র এক-পঞ্চমাংশ (১/৫) গৃহস্থালি মোট আয়ের ২.৭৮ শতাংশ পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে গরিবের হিস্যা হ্রাস পেয়ে ১.২৪ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে আয়ের সর্বোচ্চ স্তরে ৫ শতাংশ গৃহস্থালির ২০১০-এ আয়ের হিস্যা ছিল ২৪.৬ শতাংশ। ২০১৬-তে ধনীদের হিস্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৭.৯ শতাংশে। এই সময়ে গরিব ও ধনীর মধ্যে আয়ের বৈষম্য অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ২০০৫-এ গিনি সূচক ছিল ০.৪৬৭ এবং ২০১০-এ ছিল ০.৪৫৮। অর্থাৎ ঐ সময়ে আয় বৈষম্য খানিকটা  হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু ২০১৬-তে গিনি সূচক ০.৪৮৩ দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো আয়-বন্টনে এই সময়ে বৈষম্য অনেক তীব্রতর হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা ‘গিনি সূচক’ ০.৫ হলে অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে করেন। বাংলাদেশ ২০১০ থেকে ২০১৬-তে সেই বিপজ্জনক অবস্থার খুব কাছাকাছি চলে গেছে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বৈষম্য বৃদ্ধি কোনোক্রমেই জনকল্যাণের ইফঙ্গত দেয় না। অর্থনীতির এই চেহারার জন্য দায়ী হলো শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ভয়াবহ লুণ্ঠন, মূল্যস্ফীতি, মেগা-প্রকল্প কেন্দ্রিক ডাকাতি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ও সর্বস্তরে লাগামহীন ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। : তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তাদের উন্নয়নের বয়ানকে দৃশ্যমান করার জন্য কোশেশ করছে। মেগা-প্রকল্পগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ইতিমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করছে। এসব প্রকল্পের ব্যয় ভারত, চীন ও ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। সঠিক সময়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত না হওয়ায় একাধিকবার প্রকল্প-ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন করতে হচ্ছে। ফলে এসব প্রকল্প থেকে কাক্সিক্ষত কল্যাণ সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে। : বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে বলে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, একটি জাতীয় দৈনিকের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ ২০১৭ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট ঋণের ১০.৫৩ শতাংশ। ২০১৬ মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এসব মন্দ ঋণ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এ তথ্য খেলাপির হিসাবে নিলে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। হিসাবটি আঁতকে ওঠার মতো। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি টিম সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপ অবৈধভাবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার জালিয়াতি শনাক্ত করে। এরপর একে একে বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনি গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বেসিক ব্যাংকসহ দেশের অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি ও জনগণের অর্থ লোপাটের লোমহর্ষক খবর দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে। ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার বেইল আউট প্রোগ্রামের আশ্রয় নিয়েছে। বেইল আউট প্রোগ্রামের ফলে বাড়তি করের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং সেক্টরের লুটপাট থেকে লাভবান হচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি। এসব লুটপাটের সঙ্গে দেশ থেকে অর্থ পাচারের যোগসূত্র রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যা কখনও কোনো দেশে ঘটেনি সে রকম ঘটনাই ঘটেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভের ৮০৮ কোটি টাকা সমমানের বৈদেশিক মুদ্রা লোপাট হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। কেন প্রকাশ করা যাচ্ছে না সে ব্যাপারেও সরকার গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা  দেয়নি। দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি এভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তাহলে দেশের টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনোক্রমেই আশাবাদী হওয়া যায় না। আর্থিক খাতে যখন এ রকম নৈরাজ্য চলছে, তখনই সরকার ব্যাংকগুলোতে পরিচালনা পর্ষদে ঊর্ধ্ব পদে একই পরিবারের ৪ জন সদস্যকে ঠাঁই করে দেয়ার যে সুযোগ করে দিয়েছে, তার ফলে ব্যাংকিং খাত আরও নাজুক হয়ে পড়বে। সরকার খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্নতার দাবি করলেও ২০১৭ সালে লাখ লাখ টন খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে। তাহলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণ হল কিভাবে? ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বন্যার ফলে খাদ্য উৎপাদনে যে ঘাটতি হয়েছে তা পূরণের জন্য যথাসময়ে পদক্ষেপ না নেয়ার ফলে বাজারে চালসহ খাদ্যশস্যের দাম সকল সময়ের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বাজারে পেঁয়াজ, ডাল ও সবজিসহ প্রত্যেকটি খাদ্যদ্রব্যের দাম অসহনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। : টিসিবি’র তথ্য অনুযায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির একটি তুলনামূলক চিত্র দেয়া হলো : : : পণ্যের নাম (কেজি/লিটার)    ১২-০৯-২০০৬    (টাকার অংকে)    ১২-১২-২০১৭    (টাকার অংকে)             : ১    মোটা চাল    ১৭.৫০           ৪২-৪৬ *বাস্তবে আরও বেশি     : ২    সরু চাল    ২৪.৫০                  ৫৮-৬৬ *বাস্তবে আরও বেশি     : ৩    পিঁয়াজ    ৮-২০    ১১৫-১৩০ (দেশি) : ৭৫-৯০ (আমদানীকৃত)     : ৪    সয়াবিন তেল    ৪৪-৫০                   ১০৪-১০৯     : ৫    গরুর গোশত    ১৪০-১৫০                 ৪৮০-৫০০     : ৬    গুঁড়া দুধ    ২৮৫-৩৪৫              ৫৮০-৫৯০     : ৭    মসুর ডাল    ৪৫                  ৬০-১২০     : ৮   মুরগি (ব্রয়লার)    ৫৫    ১২০-১৩০     : ৯    আটা    ১৭ (খোলা), ২০ (প্যাকেট)    ২৮-৩০ (খোলা), ৩২-৩৫ (প্যাকেট)     : ১০   ময়দা    ২১ (খোলা), ২৬ (প্যাকেট)    ৩৪-৩৮ (খোলা), ৪৪-৪৫ (প্যাকেট)     : ১১ ডিম (প্রতি হালি)    ১২     ২৫-২৮     : ১২   আলু    ৬    ১৪-১৮ *বাস্তবে আরও বেশি     : ১৩   মুগ ডাল    ৩০-৩২     ১০০-১৫০     : এ সময়ে দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি কৃষি, শিল্পসহ অর্থনীতির সকল খাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এর ফলে ৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে বলে একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল ২০২১ সালের মধ্যে শতকরা ১৩ ভাগে নিয়ে আসা। সরকারের চলতি মেয়াদে দারিদ্র্যের আনুমানিক হার ১৫ শতাংশের নিচে নামানোর কথা ছিল। বাকি ১ বছরে সেটির বাস্তব রূপ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। দারিদ্র্য হ্রাসের হার এ সরকারের সময় বরং কমে এসেছে। : সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রশ্ন হলো এই সরকারের দাবীকৃত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যাচ্ছে কোথায়? সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (এঋও)-এর প্রতিবেদনটি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। এই প্রতিবেদনে বলে হয়েছে, কেবল ২০১৩ সালে দেশ থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালেই দেশ থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। ২০১৪ সালের পাচারের এই পরিমাণটি জিডিপির প্রবৃদ্ধির ৪% এর মতো। জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৭% এর মধ্যে যদি ৪% বাইরে পাচার হয়ে যায় তাহলে দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনে কিভাবে প্রবৃদ্ধির প্রভাব লক্ষণীয় হবে? এ থেকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হলো কেন এদেশের অনেক বিনিয়োগকারী দ্বৈত-নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে? কেন তারা তাদের অর্থ দেশে বিনিয়োগ করার চাইতে বিদেশে রাখাটাই পছন্দ করছে? এই পাচার হওয়া টাকার একটা বড় অংশ হলো অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকা। আর পাচার হওয়ার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দেশের অর্থনীতির প্রতি আস্থার অভাব, দেশের বাইরে একটি নিরাপদ বলয় তৈরি করে রাখা যাতে সুযোগমতো বেরিয়ে যাওয়া যায়, আমাদের ব্যাংকগুলোর করুণ অবস্থা এবং সর্বোপরি লুটের টাকার একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি। বিদেশে বাংলাদেশের এত বিরাট অংকের টাকা চলে যাচ্ছে অথচ সরকার একেবারেই নীরব। রহস্যজনকভাবে বিশাল অংকের এই টাকা ফিরিয়ে আনার কোনো সরকারি উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না।  ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাত্র ৭ বছরে দেশের ৭ লাখ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া আর্থিক খাতের লুটপাটের প্রায় পুরোটাই ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মচারী ও বড় মাপের প্রতারক ও টাউটরা প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করেছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাইসহ ইউরোপের বেশকিছু দেশে সেকেন্ড হোম এবং ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছেন এই লুটেরার দল। কালোবাজারি ব্যবসা, ব্যাংক লুটপাট, শ্রমিকদের শোষণ, ঘুষ-দুর্নীতি, শেয়ারবাজার লুট, গখগ-এর মাধ্যমে প্রতারণা ইত্যাদির মাধ্যমে এই ডাকাত দল টাকার পাহাড় গড়ে তুলে বিনা বাধায় তা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরের গড়ে বিদেশে টাকা পাচার হয় ৮১ হাজার কোটি টাকা। শুধু ২০১৫ সালেই বিদেশে পাচার হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা খুবই উদ্বেগজনক। ২০১১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিরা ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা জমা করে; আর ২০১৫ সালে জমা করে ৪ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। মাত্র ৪ বছরে জমাকৃত টাকার পরিমাণ ৪ গুণ বেড়ে যায়। : বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের মানুষের রক্ত চুষে লাখ লাখ হাজার কোটি টাকা বিদেশে প্রেরণ করার ফলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কমে এসেছে। মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে আর বেকার সমস্যা বাড়ছে। মানুষের মৌলিক অধিকার লুন্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু টাকা পাচার রোধে দৃশ্যত সরকারের কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। কারণ দেশের ভেতর বিভিন্নভাবে লুটপাট করে অবৈধভাবে অর্জিত এসব টাকা বিদেশে পাচার করার সাথে যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই আওয়ামী ঘরানার লোক বা আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ‘আগুন সন্ত্রাসে’ নিহতদের কথা বলেছেন। ঐ সন্ত্রাস আসলে কে করেছে এটা জানার আগ্রহ আমাদেরও। গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জনগণের সামনে হেয় করার জন্য তা ছিল এক সরকারি অপচেষ্টা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রচেষ্টায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছে তার কথা সকলেই অবগত আছেন। গত ১০ বছরে কমপক্ষে ৭৫০ জন গণতন্ত্রকামী কর্মীকে গুম করেছে সরকারি বাহিনী। অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবলমাত্র  ২০১৭ সালে সরকারি বাহিনী কর্তৃক গুমের শিকার ৮৬ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে। ৪৫ জনকে গুম পরবর্তী আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ১৬ জনকে ছেড়ে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত বাকি ১৬ জনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। গুম ও খুনের শিকার পরিবারগুলোই বোঝে তাদের কি কষ্ট। : প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে সম্পূর্ণভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।’ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরূপ। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার কেবল রুটিনওয়ার্ক করবেÑ এমন কিছু উল্লেখ নেই। সংবিধানের ১৫তম ও ১৬ তম সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনকে পাকাপোক্ত করার একটি ব্যবস্থাই করা হয়েছে মাত্র। সংবিধান ও গণতন্ত্র সব সময় সমার্থক বা সমান্তরাল হয় না। তাই যদি হতো তা হলে হিটলার ও মুসোলিনির শাসনকেও গণতান্ত্রিক বলা যেত। কারণ তাদের শাসনও সংবিধান অনুযায়ীই ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন কিছু ভেবে থাকেন তা হলে তার উচিত হবে এ নিয়ে সকল স্টেক-হোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া। আমাদের দল মনে করে একটি আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে ২০১৮-এর নির্বাচন সম্পর্কে অর্থবহ সমাধানে আসা সম্ভব। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমাদের দলের একটি চিন্তা-ভাবনা আছে। একটি সুন্দর পরিবেশে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলে জাতির মনে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমরা আস্থা রাখতে চাই। : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বর্তমানে গরিবরা আরও গরিব হয়েছে। আয় কমেছে ৬০ ভাগ মানুষের। সুশাসনের অভাবে এমন হচ্ছে বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
33729 জন