গুম ও গুপ্তহত্যার মতো ঘটনার সুরাহা হয়নি : মানবাধিকার কর্মীদের অভিমত
গত তিন বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি
Published : Wednesday, 31 January, 2018 at 12:00 AM, Update: 30.01.2018 10:24:57 PM
দিনকাল রিপোর্ট : গত ৩ বছরে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে ধাবিত হয়েছে। গুম ও গুপ্তহত্যার মতো ঘটনাগুলোরও কখনো সুরাহা হয়নি এমনটি দাবি করছে মানবাধিকারকর্মীরা। তবে জঙ্গিবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে। পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হকের মেয়াদে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। : ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর জঙ্গিবিরোধী অবস্থানে তৎপর হয় প্রশাসন। দেশেজুড়ে গত তিন বছরে ৩০টি জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয় ৭৯ জঙ্গি। জঙ্গিদের হামলায় প্রাণ দিতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৮ সদস্যকেও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন ধারাবাহিক অভিযানে ব্যর্থ হয় জঙ্গিদের তৎপরতা। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুলিশের মহাপরিদর্শক পদে আসেন একেএম শহীদুল হক। গতকাল মঙ্গলবার শেষ হয় তার মেয়াদ। তার সময়ে গত তিন বছরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মূল্যায়নে প্রশংসা করেছেন সাবেক পুলিশ প্রধান নুরুল হুদা। মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, এই তিন বছরে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কেবল অবনতিই হয়েছে। এত সব ঘটনা এবং অঘটনের এই তিন বছরে পুলিশ মহাপরিদর্শক শহীদুল হকের দাবি, তিনি সফল। : এদিকে সার্বিকভাবে এ বছর মানবাধিকার পরিস্থিতিকে চরম উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এর আগে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে শীপা হাফিজ বলেন, ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে যখন মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর জন্য সরকার চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন, আমাদের মনে হচ্ছে, আমাদের দেশে শিশু ধর্ষণ এবং শিশুর ওপর অনাচার-অত্যাচারগুলো তখন থেকে অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে। তবে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের েেত্র কিছুটা : ইতিবাচক অগ্রগতির ধারা ল্য করা গেছে বলেও জানান তিনি। আসকের সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ২০১৭ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনার পাশাপাশি এ বছর বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার েেত্র যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে আসক গুম, খুন, নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান দিয়েছে। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হন ৬০ জন। এর মধ্যে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়, আটজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়, পরিবারের কাছে ফেরত আসে সাতজন। বাকি ৪৩ জনের খোঁজ মেলেনি এখনও। এছাড়া ‘রহস্যজনক’ নিখোঁজের সংখ্যা আরও ৩১ বলে জানিয়েছে আসক। তাদের মধ্যে ৯ জন ফেরত এলেও তাদের ছয়জনকে গ্রেফতার দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী; পরিবারের কাছে ফেরত গেছেন তিনজন। বছরটিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, নির্যাতন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়েও বরাবরের মতো উদ্বেগ জানিয়েছে আসক। তাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ‘ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুলিবিনিময়’ এবং হেফাজতে মোট ১৬২ জন নিহত হন। এর মধ্যে ‘ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ও গুলিবিনিময়ে’ নিহত হন ১২৬ জন। : মোবাশ্বার হাসান সিজারের সন্ধান দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোশ পরে এই প্রতিবাদ হয়েছিল, সিজারসহ কয়েকজনকে ফেরত পাওয়া গেলেও ফেরেননি বেশিরভাগই মোবাশ্বার হাসান সিজারের সন্ধান দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোশ পরে এই প্রতিবাদ হয়েছিল, সিজারসহ কয়েকজনকে ফেরত পাওয়া গেলেও ফেরেননি বেশিরভাগই বাকিদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে শারীরিক নির্যাতনে ১২ জন, গ্রেফতারের আগে ও পরে ১৮ জন, গ্রেফতারের পর আত্মহত্যায় একজন, অসুস্থ হয়ে চারজন এবং একজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এছাড়া কারাগারে ৫৩ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ৩৩ জন হাজতি ও ২০ জন কয়েদি ছিলেন। বছরটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যও ‘উদ্বেগজনক’ ছিল বলে মন্তব্য করেন ফয়জুল কবির। তিনি বলেন, এ বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের ২১২টি প্রতিমা, ৪৫টি বাড়িঘর ও ২১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। এসব ঘটনায় একজন নিহত ও ৬৭ জন আহত হন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারার অপব্যবহার এবং মতপ্রকাশের বাধা দেয়ার ঘটনার কথাও আসে আসকের প্রতিবেদনে। ফয়জুল কবির বলেন, আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় সাংবাদিক, লেখকসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে টিভি টকশোসহ সংবাদমাধ্যমে লেখা ও স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য লেখক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের হুমকি ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রভাবশালী, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী ও মতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ১২২ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ বছর শিাপ্রতিষ্ঠানসহ কর্মস্থলে যৌন নির্যাতন ও বখাটে দ্বারা উত্ত্যক্ত করার ঘটনা বেড়েছে বলে আসকের পর্যবেণ। ফয়জুল কবির বলেন, যৌন হয়রানিসহ সহিংসতার শিকার হন ২৫৫ জন; এর মধ্যে ১২ জন নারী আত্মহত্যা করেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিন নারীসহ ১৩ জন খুন হয়েছেন, বখাটেদের প্রতিবাদ করায় লাঞ্ছিত হয়েছেন ১৬৮ জন ও চার মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। : ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন,  ধর্ষণের হাত থেকে এবার শিশু কিংবা বৃদ্ধ কেউই রেহাই পায়নি। এ বছর সারাদেশের ৮১৮ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যা ২০১৬ সালের চেয়ে বেশি। এ বছর ধর্ষণের শিকার হন ৬৫৯ জন। এ বছর সালিশ ও ফতোয়ার মাধ্যমে ১০ জন নারী নির্যাতনের শিকার হন জানিয়ে ফয়জুল কবির বলেন, এসব ঘটনার মধ্যে গ্রামছাড়া, সমাজচ্যুত ও একঘরে করে রাখার ঘটনা ঘটেছে তিনটি, হিল্লা বিয়ে ও দোররার শিকার হয়েছেন আরও তিনজন নারী। এছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন চারজন। ২০১৭ সালে ৩০৩ জন নারী যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হন জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে ১৪৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ জন আত্মহত্যা করেন। এসব ঘটনায় ১৮৮টি মামলা হয়েছে। এছাড়া এবছর পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হন ৪৪১ জন নারী। এদের মধ্যে স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সদস্যদের দ্বারা ২৭০ জন হত্যাকান্ডের শিকার হন। নিজ পরিবারে হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৪ নারী এবং নির্যাতনের ফলে আত্মহত্যা করেন ৫৭ জন নারী। এসব ঘটনায় ২৩৮টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আসক। অন্যদিকে এবার ৪৩ জন নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হন, এর মধ্যে ২৬ জন গৃহকর্তার বাড়িতে মারা যান। আর অ্যাসিডের শিকার হন ৩২ নারী, এর মধ্যে একজন মারা যান। এ বছর এক হাজার ৬৭৫ শিশু হত্যা ও বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছেন আসক। এর মধ্যে ৩৩৯ শিশু হত্যা করা হয়, আত্মহত্যা করে ১১৭ শিশু ও রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে ৩৭ শিশুর। এছাড়া এবার শিশুর প্রতি যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ও উত্ত্যক্তকরণের ৫৬৫টি ঘটনা ঘটেছে। এবার কর্মেেত্র অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজের কারণে অগ্নিকান্ড ও ভবন ধসের ৩০৫টি ঘটনা ঘটেছে জানিয়ে বলা হয়,  এসব দুর্ঘটনায় ৪০৫ জন শ্রমিক নিহত হন। এছাড়া সভা-সমাবেশে বাধা, আদিবাসীদের বাড়িঘরে হামলা, চিকিৎসােেত্র নৈরাজ্য ও ত্রুটিপূর্ণ চিকিৎসার কারণে রোগীর মৃত্যু, সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতনের বেশ কিছু ঘটনা তুলে ধরেন আসকের সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। : : : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে বিরোধী দলকে সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
36823 জন