ছিনতাইকারীদের নিষ্ঠুরতা চরমে গতকালও ছুরিকাঘাতে নিহত ২
Published : Friday, 2 February, 2018 at 12:00 AM, Update: 01.02.2018 9:47:05 PM
মাসুদুর রহমান, দিনকাল : আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতিতে রাজধানী জুড়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। প্রতিদিনই নগরীর কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন, আহত হচ্ছেন এমনকি নিহতের ঘটনাও ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম অবহেলায় এসব ঘটনায় আতংকিত হয়ে পড়েছেন নগরবাসী। নিরাপদে চলাচল এখন কঠিন হয়ে পড়লেও নির্বিঘেœই ঘটছে ছিনতাই। গতকালও ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে দুই জন নিহত হয়েছেন। : গত ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে রাস্তা পার হওয়ার সময় হেলেনা বেগমের ভ্যানিটিব্যাগ ধরে টান দেয় ছিনতাইকারীরা। এ সময় ছিনকাইকারীদের গাড়ির নিচে পড়ে চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান হেলেনা। একই দিনে রাজধানীর স্বামীবাগে ছিনতাইকারীদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান ওয়ার্কসপ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহীম। ঐদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর হাজারীবাগে জাকির হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করে ২০ হাজার টাকা নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। গত ২৯ জানুয়ারি দুপুর পৌনে একটার দিকে বনানীর নিউ এয়ারপোর্ট রোড এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তাজুল মাতবর। কয়েকজন ছিনতাইকারী তার গতি রোধ করে  ভয় দেখিয়ে তার কাছে থাকা টাকা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টাকালে ধরা পড়েন দুই ছিনতাইকারী।  একই দিন দুপুরে রাজধানীর বঙ্গভবনের দণি পাশে অভিনব ছিনতাইয়ের শিকার হন প্রথম আলোর সহকারী বার্তা সম্পাদক কাজী আলিম-উজ-জামান। এ সময় স্যার সøামালিকুম। কেমন আছেন? অনেক দিন আপনার সঙ্গে দেখা হয় না। আমার বড় ভাই প্রায়ই আপনার কথা বলেন। একথা বলে তার রিকশা আগলে দাঁড়ান এক যুবক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশ থেকে আরও দুজন এসে তার মুঠোফোনটি নিয়ে যায়। গত ৩০ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে প্রাণ কোম্পানির দুই কর্মকর্তার কাছ থেকে ছিনতাইকালে হাতেনাতে আটক হয় ছাত্রলীগের দুই কর্মী। এরা হলেন- রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মারুফ হোসেন এবং উর্দু বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের বিল্লাল হোসেন। মারুফ হোসেন সূর্যসেন হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুল ইসলাম : শাহীনের এবং বিল্লাল হোসেন বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফকির রাসেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। গত ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর দয়াগঞ্জে রিকশা চলন্তাবস্থায় ছিনতাইকারীরা মায়ের হাতের ব্যাগ আচমকা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে মায়ের কোলে থাকা শিশু আরাফাত কোল থেকে পড়ে মারা যায়। গত ১৪ ডিসেম্বর রাত ১২টার দিকে মালিবাগ রেলগেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কাব সংলগ্ন রাস্তায় মাথায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এক সংবাদকর্মীর মোবাইল ফোন সেট ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ওই ছিনতাইয়ের ২০ মিনিট আগে রবিন নামে আরো এক ব্যক্তি একই স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হন। ভুক্তভোগী সংবাদকর্মী শাজাহানপুর থানায় একটি জিডি করেন। এই জিডির তদন্তের কোনো কুল কিনারা হয়নি। ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর টিকাটুলি এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মৃত্যু হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খন্দকার আবু তালহার। ৫ ডিসেম্বর ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে মারা যান জাতীয় হৃদরোগ ইন্সস্টিটিউটের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ফরহাদ আলম। রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি  বেড়েছে ‘টানা পার্টি’র দৌরাত্ম্য, যারা ছোঁ মেরে ব্যাগ, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, ভ্যানিটি ব্যাগ, হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। ভুক্তভোগীরা বলছেন, রাতের বেলা রাজধানীর রাস্তায় টহল পুলিশ দেখা যায় না। কোথাও কোথাও নামমাত্র তল্লাশিচৌকি থাকলেও সেগুলো কাজ করে না। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত অনেক সড়ক ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। রাজধানীতে ছিনতাইয়ের স্পট রয়েছে প্রায় দেড়শ। এর মধ্যে ভয়ঙ্কর জোন হচ্ছে রাজধানীর শাপলাচত্বর থেকে টিকাটুলি মোড়, গোপীবাগের রাস্তা, মতিঝিল কালভার্ট রোড হয়ে আরামবাগ, মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনির পাশের রাস্তা, পীরজঙ্গির মাজার, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের আশপাশের এলাকা, যাত্রাবাড়ী মোড়, জুরাইন রেলগেট থেকে পোস্তগোলা ব্রিজ, পুরনো পল্টন মোড়, কাকরাইল মোড় থেকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল মোড়, রাজারবাগ পূর্বপাশের মোড় থেকে শাহজাহানপুর রেললাইন, মালিবাগ রেলগেট থেকে খিলগাঁও ফাইওভারের নিচ পর্যন্ত, মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ মোড়, দোয়েল চত্বর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রাস্তা, নিউ মার্কেটের দণি দিকের রাস্তা, আজিমপুর মোড়, ধানমন্ডি ২ নম্বর রাস্তা, গ্রীন রোড, পান্থপথ মোড় থেকে রাসেল স্কয়ার, আগারগাঁও ক্রসিং থেকে শ্যামলী শিশু মেলা, আগারগাঁও তালতলা, টেকনিক্যাল মোড় থেকে মিরপুর-১ নম্বর গোলচক্কর, মহাখালী থেকে তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়, এফডিসি ক্রসিং, হাতিরপুল, কমলাপুর, মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক রোড, গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা, সায়দাবাদ বাস টার্মিনালের সামনের রাস্তা, জনপদ মোড়, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, পল্লবীর বেড়িবাঁধ, আব্দুল্লাহপুরসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্ট। : প্রতিদিন রাজধানীতে ছিনতাইয়ের অসংখ্য ঘটনা ঘটলেও এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ হয় না বললেই চলে। একমাত্র গুরুতরভাবে আহত কিংবা মৃত্যুর ঘটনা থানা পর্যন্ত পৌঁছে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো জিনিস খোয়া গেলে থানায় জানানো হয়। অভিযোগ করলেও কোনো লাভ হয় না বরং উল্টো নানা ঝামেলায় পড়তে হয় বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ভুক্তভোগী ব্যক্তি, হাসপাতালসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, গত দুই মাসে (ডিসেম্বর থেকে গত ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত) রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০০ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মহানগর পুলিশের সদর দফতরের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১ মাস ২৭ দিনে ছিনতাই ও দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়েছে মাত্র ১৫টি। ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রাপ্ততথ্য মতে, গত চার মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ২১টি। তবে অধিকাংশ ঘটনায় থানা পুলিশ জিডি নিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। ৪৯টি থানায় এই চার মাসে প্রায় দেড়শ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ যে প্রক্রিয়ায় ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যান নথিবদ্ধ করে তা অত্যন্ত জটিল। পিআরবি অনুযায়ী চারজনের অধিক ব্যক্তি কারও টাকা ছিনিয়ে নিলে তা ‘ডাকাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হাতেনাতে ছিনতাইকারী গ্রেফতার হলে তা ‘দ্রুত বিচার’ আইনের আওতায় ফেলে নথিবদ্ধ করা হয়। : ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ছিনতাই নিয়ে বলেন, দেড় কোটি মানুষের বাসের এই শহরে হঠাৎ করে সেদিন দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় দুজন নিহত হন। এতে ছিনতাই বাড়েনি। তারপরও ডিবি ও থানা পুলিশকে দিয়ে টিম গঠন করে ছিনতাই বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। : : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

বাম মোর্চার নেতৃবৃন্দ বলেছেন, দমনমূলক শাসনের জন্যই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। আপনিও কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
17 জন