বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি : নানা জটিলতায় আটকে আছে চার্জশিট
Published : Sunday, 4 February, 2018 at 12:00 AM
দিনকাল রিপোর্ট : বাংলাদেশি ছাড়াও যেসব বিদেশি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রায় সবাইকেই চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। কিন্তু নানা জটিলতায় তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ সোমবার রাতে (২৯ জানুয়ারি) সিআইডির অর্থনৈতিক অপরাধ বিভাগের স্পেশাল পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সিঙ্গাপুর গেছেন। রিজার্ভ চুরির তদন্তের কাজেই তারা সেখানে গিয়েছেন কিনা, জানতে চাইলে বিষয়টি পরিষ্কার না করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি কাজে তারা সিঙ্গাপুর গেছেন। প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে সুইফট কোডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে নেয় দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কা এবং ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চলে যায় ফিলিপাইনের জুয়ার আসরে। এই ঘটনার প্রায় একমাস পর ফিলিপাইনের একটি পত্রিকার সংবাদের মাধ্যমে বিষয়টি বাংলাদেশ জানতে পারে। এ ঘটনা চেপে রাখতে গিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন ড. আতিউর রহমান। বড় ধরনের রদবদল করা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মানি লন্ডারিং আইনে ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরির অভিযোগ এনে ১৫ মার্চ (২০১৬) মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর সিআইডি এ পর্যন্ত ২০ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালতের কাছ থেকে সময় চেয়ে নিয়েছে। : এদিকে, গত সোমবার (২৯ জানুয়ারি) নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, ‘চুরি যাওয়া আট কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে এখন পর্যন্ত ফেরত এসেছে এক কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এর বাইরে ৫ কোটি ডলার ফেরত আসার বিষয়ে আদালতের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। ১২ লাখ ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকে ফেরত আসার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আরও ছয় মিলিয়ন ডলার আসার ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এই ৬০ লাখ ডলার আনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিআইডির একটি দল ২৯ জানুয়ারি রাতে সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনে যাচ্ছেন।’ : রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আদালতের কাছ থেকে এ পর্যন্ত ২০ বার সময় চেয়ে নিয়েছেন সিআইডির বিশেষ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খান। রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিআইডি’র অর্গানাইজড ও ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় চিঠি দিয়েছি। এছাড়া আমাদের অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অ্যাটর্নি জেনারেলকেও চিঠি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’ বিদেশিদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদ কিভাবে করবো? আমরা তো পারবো না। ওদেশের পুলিশ করবে। সেজন্য সেসব দেশের পুলিশের কাছে একটা অনুরোধপত্র পাঠিয়েছি। আরও একটা পাঠাবো।’ দেশের ভেতরে যারা জড়িত তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আগে বিদেশিদের বিষয়টি প্রাধান্য দিচ্ছি। কারণ চুরির টাকাটা তাদের কাছে। আমরা চুরির সঙ্গে জড়িত বিদেশিদের চিহ্নিত করেছি। বিদেশিদের বিষয়টি পুরোপুরি শেষ না করে দেশের ভেতরের দিকে আগাচ্ছি না। দেশে কারা কারা জড়িত, তাদেরও চিহ্নিত করে রেখেছি। তবে টাকাটা কিভাবে গেলো, কী অবস্থায় আছে, সেটা শেষ করেই এদিকে অগ্রসর হবো।’ সিঙ্গাপুর কিংবা ফিলিপাইন যাচ্ছেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশের বাইরে যাচ্ছি সরকারি কাজে।’ : মামলার তদন্ত কবে শেষ হবে ও চার্জশিট কবে দেবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মোল্লা নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এটা বলা মুশকিল। কারণ টাইম ফ্রেম দিয়ে তদন্ত হয় না। এটা একটা ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। প্রায় আট-নয়টি দেশের ক্রিমিনালরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। সেসব দেশের ক্রিমিনালদের সব তথ্য আমাদের আনতে হচ্ছে। এগুলো করতে একটু সময় লাগবে। এগুলো যত তাড়াতাড়ি আমরা পেয়ে যাবো, তত তাড়াতাড়ি চার্জশিট দিয়ে দেবো।’ তদন্ত সংস্থা এফবিআই তদন্তে কোনও সহযোগিতা করছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এফবিআই-এর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। তারা আমাদের বিষয়গুলো দেখছেন। একসঙ্গেই আমরা কাজ করছি।’ : কোনও কোনও দেশের লোক জড়িত জানতে জানতে চাইলে মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চায়না ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত। সেজন্য সেসব দেশে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আমরা সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা দিয়ে তথ্য জানতে চেয়েছি। কিছু দেশে অ্যাটর্নি জেনারেল টু অ্যাটার্নি জেনারেল চিঠি পাঠানো হবে। বাংলাদেশেরও কিছু লোক আছে। যারা সহায়তা করেছে।’ বাংলাদেশের ব্যাংকের ভেতরে নাকি বাইরের লোক জড়িত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ভেতরের কিছু লোক তো আছেই। বাইরের লোক সম্পর্কে এখন বলবো না। আমরা আরও তদন্ত করে জানতে পারবো বাইরের কেউ জড়িত আছে কিনা।’ : বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে কোনও তথ্য পেয়েছেন কিনা, জানতে চাইলে মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। সংশ্লিষ্ট দেশের অ্যা¤॥^াসেডররাও চেষ্টা করছেন। ফিলিপাইনের কাছ থেকে একটা উত্তরও পেয়েছি।’ বিদেশি জড়িতদের বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যবস্থা নেবেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তখন আমরা ইন্টারপোলের সহযোগিতা নেবো। আমাদের কোর্ট যদি কোনও আদেশ দেন, সেই আদেশ আমরা কার্যকর করার চেষ্টা করবো।’ এ ঘটনা জড়িত থাকার অভিযোগে চীনে দু’জনের গ্রেফতার হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা চীন অ্যা¤॥^াসির সঙ্গে কথা বলেছি, তারা সহযোগিতার কথা বলেছেন। শিগগিরই আবার চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করবো।’ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিনের রিপোর্ট তদন্তে কোনও হেল্প হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অফিসিয়ালি আমরা এ ধরনের রিপোর্ট এখনও পাইনি। তারা যেহেতু অফিসিয়ালি এখনও প্রকাশ করেনি, তাই সেটি নিয়ে কিছু বলা যাবে না।’ চার্জশিট না দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকও তাদের অফিসিয়ালদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটার জন্য আরেকটা আটকে থাকবে না। তারা তাদের ফাইন্ডিংসে যদি কিছু পান, তাহলে তারা তাদের ব্যবস্থা নেবেন। আমাদের তদন্তের সঙ্গে তাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই।’ : :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার করা হচ্ছে না। আপনি তার সঙ্গে একমত?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
34003 জন