নির্বাচনের বছরে খালেদা জিয়ার রায় রাজনৈতিক সঙ্কট ঘনীভূত করবে
Published : Sunday, 11 February, 2018 at 12:00 AM, Update: 10.02.2018 11:15:56 PM
দিনকাল রিপোর্ট : নির্বাচনি বছরেই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় ও নেতাকর্মীদের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিপরীতমুখী অবস্থানে দেশের বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তাদের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়ে চলেছে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। দুই দলের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে দেশের রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা এ মুহূর্তে নেই। তবে বর্তমানে উদ্ভূত পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা আগামী সপ্তাহে কিছুটা ইঙ্গিত মিলবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজার বিরুদ্ধে আদালত আপিল গ্রহণ করেন কিনা কিংবা তাকে দ্রুত জামিন দেন কিনা, তার ওপর রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা নতুন মোড় নেবে। তাদের আশঙ্কা- আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় না এলে দেশ আবারও গভীর সংকটে পড়তে পারে। তাই দেশ ও দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে বড় দুই দলকে এক টেবিলে বসার বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তারা। এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ছিল। খালেদা জিয়ার সাজা এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন তা আরও ভয়াবহ মাত্রা ধারণ করেছে। তিনি বলেন, আমরা যদি এ পরিস্থিতির লাগাম টেনে ধরতে না পারি, তবে আমাদের পরিণতিটা মঙ্গল নাও হতে পারে। আমাদের সবাইকে ‘নকআউট মার্চ’ থেকে সরে আসতে হবে। কারণ এটার পরিণতি শুভ হবে না। অতীতে শুভ হয়নি এখন নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, এটা আরও অশুভ হবে। বিদ্যমান সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক টেবিলে বসার পরামর্শ দেন এ বিশ্লেষক। : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দীন খান বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক সংকট তো আছেই। খালেদা জিয়ার সাজা ও বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে এ সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। রাজনৈতিক সংকট সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই। দ্রুত সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছি না। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। আদালত খোলার পর খালেদা জিয়ার আপিল গ্রহণ ও জামিন হয় কিনা সেটা দেখে আরও স্পষ্ট বোঝা যাবে। বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে চলে গেলেও ইস্যুটি অনেকটা রাজনৈতিক। তাই রাজনৈতিকভাবে এ সংকট উত্তরণে দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করতে হবে। এ সংকট উত্তরণে কোনো উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের রায়কে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার ও তাকে কারাদন্ড দেয়ার ঘটনা আদালতের গন্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপিসহ অনেকেই মনে করছে, সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এসব করছে। যেখানে আগামী নির্বাচন কোন প্রক্রিয়ায় হবে, তা নিয়ে দুই দলের মধ্যে এখনও কোনো সমঝোতা হয়নি, সেখানে গ্রেফতার ও কারাদন্ডের বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এর ফলে চলমান সংকট আরও ঘনীভূত হবে। : তিনি বলেন, দল দুটির মধ্যে আবারও বিপরীতমুখী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটা কাম্য নয়। নির্বাচন নিয়ে তাদের অবশ্যই ঐকমত্যে আসতে হবে। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের একটি সমাধান বের করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সমাধানে না এলে দেশ আবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্য পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বড় দুই দল এক টেবিলে বসলে একটি সমাধান বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন এ বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আদালতের রায়ে কারাগারে যাওয়ায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। নির্বাচন আসছে। নির্বাচনটা তো অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে। সে রকম একটি নির্বাচনের জন্য পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার মামলাটা সেই পরিবেশ তৈরির সহায়ক হয়নি। দেশে কত শত শত কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা বা সাজা হওয়ার কথা কমই শোনা যায়। সে তুলনায় বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, টাকার পরিমাণ বিবেচনায় তেমন বড় নয়। : তবে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন এমন একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ নিঃসন্দেহে গুরুতর। কিন্তু সেই মামলার নিষ্পত্তি নির্বাচনের আগেই করে ফেলা অনিবার্য ছিল না। সেটাই জরুরি করে তোলা হলো। এর ফলে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণমূলক যে নির্বাচনের কথা আমরা বলছি, তাও অনিশ্চিত করে ফেলা হলো। এটা সব সময়ই দেখা গেছে, যে নেতারা কারাগারে যান, তাদের প্রতি মানুষের একটু আলাদা সহানুভূতি তৈরি হয়। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও যে সেটা হবে না, তা তো বলা যায় না। তবে তার পাশাপাশি নির্বাচনের আগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে, সে বিষয়ে মানুষের মধ্যে একটা উৎকণ্ঠা তৈরি হলো। একটা শঙ্কাও সৃষ্টি হলো, যা নির্বাচনের আগে এই সময়ে না হলেই ভালো হতো। : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল একটি গণমাধ্যমকে বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার রায় রাজনীতিতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিঃশঙ্ক হওয়া যায় না। এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া এবং রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক অঙ্গনে পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে। অনাস্থা গভীরতর হয়েছে। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও অনেক জটিলতা সৃষ্টি করবে। : অভিযোগ, মামলা, বিচার- এগুলো কোনোটাই অস্বাভাবিক বিষয় নয়। সংবিধান অনুযায়ী আইনের চোখে সবাই সমান। আইন অনুযায়ী যে কারও বিচার ও শাস্তি হতেই পারে। কিন্তু সেটা শুধু শাস্তি দেয়ার জন্য বিচার হিসেবে জনমনে প্রতিভাত হওয়া উচিত নয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ মামলার বিচার অনেকটা সেভাবেই প্রতিভাত হয়েছে। : বিচারটা এমনভাবে রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে, যেন বিচারের পক্ষ রাষ্ট্র বনাম খালেদা জিয়া নন, আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি। এই মামলা নিয়ে দুই দলের পক্ষ থেকেই এত কথা বলা হয়েছে ও হচ্ছে যে, মানুষ বুঝতেই পারছে না, খালেদা জিয়া প্রকৃতই অপরাধ করে জেলে গেলেন কি না। জনমনে এ রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলে সমাজের ক্ষতি হয়। দুর্বৃত্তরা তার সুযোগ নেয়। মানুষ তখন রাজনীতিবিমুখ হতে থাকে। : এ রকম পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা থাকে না। রাজনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক অনাস্থা ও দূরত্ব বাড়তে থাকে। খালেদা জিয়ার বিচারের মধ্য দিয়ে এর সবই ঘটেছে। ফলে রায়ের দিন বড় কোনো সংঘাত না হলেও ভবিষ্যতে হবে না, এমন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। কাজেই সরকারসহ সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। : সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পারস্পরিক অনাস্থা ও দূরত্ব আরও বাড়বে। আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমার কোনো মন্তব্য নেই। একটা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত এসেছে। এরপর উচ্চতর আদালতে আরও আইনি প্রক্রিয়া চলবে, যার মাধ্যমে একসময় বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু কথা হলো, সামনে নির্বাচন। বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। তাদের তো নির্বাচনে আসতে হবে। আসতে হলে তার প্রস্তুতি হিসেবে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটা সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। বিএনপির নেতা-কর্মীদের প্রতি সরকার মোটামুটি মারমুখী অবস্থানেই আছে বলে প্রতীয়মান হয়। এবার খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করেও মোটামুটি নির্বিচারেই তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। : বিএনপি যে দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে না, এটা রাজনৈতিক অঙ্গনের একটা বড় সমস্যা। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু করতে হলে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলকে অবশ্যই নির্বাচনে আসতে হবে। নির্বাচনে অংশ নিতে হলে তার প্রস্তুতি হিসেবে তাদের দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম, সভা-সমাবেশ, মিছিল প্রভৃতি করতে হবে। এগুলো করার সুযোগ তাদের দিতে হবে। জোর প্রয়োগ করে তাদের এগুলো থেকে নিবৃত্ত রাখা উচিত নয়। একইভাবে বিএনপিরও উচিত নয় কোনো হঠকারী কার্যক্রম চালিয়ে সরকারকে দমন-পীড়ন চালানোর সুযোগ করে দেয়া। :





প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

ভারতীয় গণমাধ্যম বলেছে, এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে আ’লীগ হেরে যাবে। আপনিও কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
4977 জন