জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করুন
Published : Saturday, 18 April, 2020 at 12:00 AM, Update: 17.04.2020 9:34:55 PM
জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করুনদিনকাল রিপোর্ট
করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপকতার পরিপ্রেেিত ‘মহাদুযোর্গ’ মোকাবিলায় ‘জাতীয় টাস্ক ফোর্স’ গঠনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই দাবি জানান।
তিনি বলেন, চতুর্দিকে অন্ধকার ও হতাশা। করোনা দুর্যোগের নানামুখী প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হবে বলে মনে হয়। এমতাবস্থায় এ পরিস্থিতি মোকাবিলার ল্েয সুসমন্বিত ও সুবিবেচিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, ত্রাণ বিতরণ, বিভিন্ন সেক্টারে প্রণোদনা ও ঋণ প্যাকেজ বন্টন ইত্যাদি বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেয়ার জন্যে একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাব আমরা করছি।
এই টাস্কফোর্সে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করে এই টাস্ক ফোর্সকে অর্থবহ ও গতিশীল করার মাধ্যমে কার্যকরী পদপে গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। আমাদেরকে লড়াই করতে হবে এবং সেই লড়াইয়ে অবশ্যই আমাদের জয়ী হতে হবে।
টাস্কফোর্স গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ফখরুল বলেন, এখন যে পরিস্থিতি টাস্কফোর্স গঠন করলে সুসমন্বিত, সুচিন্তিত ও সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের ভাষায় কোনো খাদ্যের ঘাটতি নয়, খাদ্য বন্টনে অনিয়ম, দুর্নীতি, সিদ্ধান্তহীনতা, সুশাসনের অভাব দুর্ভিরে কারণ হতে পারে। তাই এখনই খাদ্য ও ত্রাণ বন্টনে এবং করোনার পরবর্তী পুনর্বাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ল্েয এই প্রক্রিয়াটিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে।
কারোনার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অগ্রাধিকার বিষয়গুলো কী হতে পারে প্রশ্ন করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, সবার আগে এখন স্বাস্থ্য, চিকিৎসা এবং টেস্ট টেস্ট টেস্ট প্রয়োজন। রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দেয়াটা সবচেয়ে আগে। যাদেরকে আইসোলেশনে নেয়া হচ্ছে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যেটা সমস্যা দেখা দিয়েছে যারা দিন আনে দিন খান-দিন মজুর যাদেরকে বলা হচ্ছে যে, ঘরে থাকো। ঘরে থাকলে তো খাওয়া আসছে না।
এদের কাছে খাদ্য পৌঁছানো, তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করা এবং তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া উচিত, টপ অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন। এটার জন্য উপযুক্ত হচ্ছে সামরিক বাহিনী। তারা স্থানীয় যে প্রশাসন আছে, জনপ্রতিনিধি আছে, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠনগুলো আছে তাদের নিয়ে এই কাজটা সহজে করা যেতে পারে। অতীতে দুই-একবার এই কাজগুলো হয়েছে তাদেরকে নিয়ে। তাদের (সামরিক বাহিনী) সাংগঠনিক যে দতা, তারা চুরি-টুরির মধ্যে থাকবে না-এই জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সময়ে।
তিনি বলেন, আমরা ঐক্যের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। বাম গণতান্ত্রিক জোট বা বাম মোর্চার ঐক্যের একটি পরামর্শসভায়ও আমি যুক্ত হয়েছিলাম। আমরা কোনো রকমের সংকীর্ণতায় ভুগতে চাই না। আমরা মনে করি যে, এখন জাতীয় ঐক্যটা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বিএনপি কোনো কাজ করছে না বলে মতাসীন দলের মন্ত্রীরা যেসব অভিযোগ করেছেন এই সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ফখরুল বলেন, বিষয়টা হচ্ছে যে, একটা রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে সরকার। সরকারের যদি জনগণের সাথে কোনো সম্পর্ক না থাকে, তাদের কোনো দায়-দায়িত্ব থাকে না, মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট থাকে না। যার ফলে এটা সরকার উপলব্ধি করছে না যে, এখন যেটা দরকার সবাইকে একখানে আনা। তাদের মধ্যে একটা ধারণা সৃষ্টি করা যে, আমরা যা কিছু করছি-ঐক্যবদ্ধভাবে করছি। ভারতে দেখুন, সেখাকার প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে কথা-বার্তা বলেছেন সমস্ত বিরোধী দলের সঙ্গে। অন্যান্য রাজ্যের চিফ মিনিস্টারের সাথে উনি কথা বলছেন, কথা বলেই কিন্তু তিনি হয়ত তার কাজটাই করছেন। কিন্তু আলাপ-আলোচনা করে নিচ্ছেন সকলের সঙ্গে। সো দেট এভরি বডি উইল ফিল উই আর হিয়ার, উই আর অলসো কনট্রিবিউটিং। এটা খুবই প্রয়োজন তো।
বিএনপি তো সবচেয়ে বড় দল। সেই বড় দলকে আপনি একেবারেই বাদ দিয়ে নিজের মতো করে কাজ করছেন, করেন। ফলো তো করছেন আমাদেরকেই দেখা যাচ্ছে। আমরা যা যা বলেছি সেই কাজগুলোই তো করছেন। সেইটাকে সুন্দর-সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করে এই গালিগালাজগুলো বাদ দিয়ে, ওই সমস্ত কথা-বার্তা বাদ দিয়ে আসল জায়গাতে আসুন। যেটা আমরা বার বার বলছি, দুঃস্থ মানুষকে বাঁচানো হচ্ছে বড় কাজ।
তিনি বলেন, কিভাবে আহাজারি করছে গার্মেন্টসের শ্রমিকরা, কীভাবে আহাজারি করছে গৃহকর্মীরা, এরা অত্যন্ত দুঃস্থ হয়ে গেছে এখন কাজ নেই। যে বস্তিতে তারা থাকে সেখানে ঘর ভাড়া দেয়ার উপায় নেই, সেখান থেকে তাদেরকে উচ্ছেদও করা হচ্ছে।
গ্রামের দিনমজুর, তেমজুর, যারা রিকসশা চালায়, ঠেলা গাড়ি চালায় ওদের সংখ্যা তো ৩ কোটি প্রায়। এই ইনফর্মাল সেক্টরের লোকজনের কথা চিন্তা করতে হবে। এই যে ফেরি করতো হকার, বাজারের আসতো এসব কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে।  
বিএনপির কর্মকা- : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,  করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আমরা এই বিষয়ে কথা বলেছি, আমরা জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য লিফলেট বিতরণ করেছি, তাদেরকে মাস্ক দিয়েছি। দুর্ভাগ্য আমাদের তথ্যমন্ত্রী সাহেব সেগুলো দেখতে পান না। তিনি বার বার বলে যাচ্ছেন এবং আওয়ামী লীগের লোকেরাও বলে যাচ্ছে যে, আমরা কিছু না কাজ করেই শুধু কথাই বলছি। এটা একেবারেই সত্য নয়।
ইতিমধ্যে সারাদেশে আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৪ মার্চ দলের নেতা-কর্মীদেরকে আহবান জানিয়েছিলেন যে, নিজেকে নিরাপদ রেখে দুঃস্থ এবং দুদর্শাগ্রস্ত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা প্রত্যেকটা জেলা, উপজেলায় আমাদের দল, সহযোগী সংগঠন, অঙ্গসংগঠনসমূহ কাজ করছে। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন কাজ করে যাচ্ছে সর্বণ। সিলেটের প্রায় ৭০ হাজার পরিবারকে খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা মহানগরীর প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আমাদের দলের নেতা-কর্মীরা খাদ্য বিতরণ করেছে। একইভাবে প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলাতে যারা প্রার্থী ছিলেন, মন্ত্রী ছিলেন, এমপি ছিলেন তারা নিজেরাই নিজস্ব উদ্যোগে তারা তাদের এলাকাগুলোতে দুঃস্থ মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করেছেন। আমার ধারণা যে, সারাদেশে কমপে ৫ ল পরিবারের কাছে আমাদের সাহায্য ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এটা অব্যাহত রয়েছে এবং অব্যাহত থাকবে।
গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সকালে এই সংবাদ সম্মেলন হয়। সম্মেলনের শুরুতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাইনুদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং এই মহাদুর্যোগে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মী, সামরিক বাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনী এবং গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করেন বিএনপি মহাসচিব।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্যাকেজ শুভঙ্করের ফাঁকি : প্রধানমন্ত্রী গত ৫ এপ্রিল ৭২ হাজার ৫শ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ও ১৩ এপ্রিলের ভাষণে সর্বমোট ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্যাকেজটি কলেবরে বড় হলেও এটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি, লোক দেখানো আইওয়াস মাত্র। প্যাকেজটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রণোদনা বলা হলেও মূলত অধিকাংশই ব্যাংক নির্ভর ঋণ-প্যাকেজ যা বিভিন্ন সেক্টরের ব্যবসায়ী মহলকে দেয়া হবে ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে। এতে সরকারের প্রণোদনা নিতান্তই অপ্রতুল।
যেমন গার্মেন্টস মালিকদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ, শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের মালিকদের জন্য ৩০ হাজার কোটি ঋণ, ুদ্র ও মাঝারী শিল্পের মালিকদের জন্য ২০ হাজার কোটি ঋণ, কৃষি খাতে ৫ হাজার কোটি ঋণ, ইডিএফ সম্প্রসারণ ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ঋণ, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট ফিন্যান্স স্কীমে ৫ হাজার কোটি ঋণসহ সর্বমোট ৭৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও এর মধ্যে সরকারের ভর্তুকি বাবদ দেবে ৩ হাজার কোটি টাকা মাত্র। অর্থাৎ ৭৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ঋণ প্যাকেজের মধ্যে মূলত সুদ ভর্তুকির ৩ হাজার কোটি টাকাই হচ্ছে সরকারি প্রণোদনা। অবশিষ্ট অর্থ সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বাভাবিক ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিতরণ করবে। এতে সরকারের খরচ হবে ৩ হাজার কোটি টাকা বাদ বাকি অর্থ আসবে ব্যাংক সূত্র থেকে।




আর্থিক ব্যাংকসমূহের দুরবস্থা, প্রবাসী রেমিটেন্স কমে যাওয়া এবং চলমান তারল্য সংকটের পরিপ্রেেিত ব্যাংকসমূহ কিভাবে ৭৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজের জন্য অর্থ সংকুলান করবে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ফখরুল।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন নসু, চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সদস্য শায়রুল কবির খোকন ও শামসুদ্দিন দিদার উপস্থিত ছিলেন।






প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা
আজকের মোট পাঠক
25116 জন