বেগম খালেদা জিয়াকে যেভাবে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল
Published : Wednesday, 25 March, 2020 at 12:00 AM, Update: 24.03.2020 11:03:06 PM
দিনকাল রিপোর্ট
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২ বছর ৪৬ দিন কারাবন্দির পর আজ মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় ৭৪ বছর বয়স্ক সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে পাঁচ বছরের সাজা দিয়ে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে বন্দি করা হয়। এই মামলায় গ্রেফতারের দেড় মাসের মাথায় জামিন পেলেও তাঁর মুক্তি মেলেনি। নতুন নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে আটক রাখা হয়। সাবেক সেনাপ্রধান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী তিনি। জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনীতিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে। জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর দেশের এক ক্রান্তিকালে বিএনপির হাল ধরেন তিনি। তুমুল জনপ্রিয় এই নারীর নেতৃত্বেই বিএনপি একাধিকবার মতায় অধিষ্ঠিত হয়।  স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পেয়েছেন ‘আপসহীন নেত্রীর’ খেতাব। ইতিমধ্যে তাঁকে ‘মাদার অব ডেমোক্র্যাসি’ বা গণতন্ত্রের মা উপাধি দিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। শুধু দলের নেতাকর্মীই নয়, দেশজুড়ে তাঁর কোটি কোটি ভক্ত-অনুসারী রয়েছেন। জামিনে দীর্ঘসূত্রতা আর নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর কারণে মুক্তি পাননি এই মহীয়সী নারী। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে আসছিলেন জামিন পাওয়া অধিকার হওয়া সত্ত্বেও জামিনযোগ্য হওয়ার পরও সরকারের নির্দেশে তাঁকে জামিন দিচ্ছে না আদালত, ফলে তাঁর মুক্তিও হয়নি। বিএনপির নেতাকর্মীসহ সবারই প্রত্যাশা ছিল জামিনে কারামুক্ত হবেন খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম খালেদা জিয়া জড়িত নন। এতিমখানার লেনদেনের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া জড়িত নন ও ব্যাংকে জমা অর্থ আত্মসাৎ হয়নি বরং ব্যাংকে তা বেড়ে তিনগুণ হয়েছে। এ মামলায় ৩২ জন সাক্ষীর কোনো সাক্ষীই আদালতকে বলেননি এ মামলায় বেগম খালেদা জিয়া জড়িত। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। কারাবন্দির পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে টালবাহানা চলে। এক মামলায় জামিন পেলে তাঁকে আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলার রায়ের সার্টিফাইড কপি পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। হাইকোর্টে আপিল করলে জামিন মঞ্জুরের পর আপিল বিভাগ তা স্থগিত করেন। পরে আপিল বিভাগ জামিন প্রদান করলেও অন্য মামলায় তাঁকে আটক দেখানো হয়। কুমিল্লার নাশকতার মিথ্যা মামলায় নিম্ন আদালত বারবার সময় ক্ষেপণ করে। এছাড়া মানহানির অভিযোগে ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নামঞ্জুর করে নিম্ন আদালত। এসব মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিতে হয়। কুমিল্লায় একটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও অপর মামলায় বারবার সময় ক্ষেপণের পর হাইকোর্টেরে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে গত ৪ ফেব্রুয়ারি জামিন নামঞ্জুর করে আদেশ দেয় আদালত। এরই মধ্যে জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলায় ৭ বছরের সাজা দেন নিম্ন আদালত। উচ্চ আদালতে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। গত ১২ ডিসেম্ব^র জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট  মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল সর্বসম্মতভাবে এই আদেশ দেন। আদালত বেগম খালেদা জিয়ার সম্মতি নিয়ে মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় পদপে নিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপকে নির্দেশ দিয়েছেন।
গত বছরের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে খালেদা জিয়াকে সাত বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড করা হয়। এই সাজা বাতিল চেয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। শুনানি নিয়ে গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট ওই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার েেত্র বিচারিক আদালতের দেয়া জরিমানার আদেশ স্থগিত করেন। গত ২০ জুন মামলার নথি বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্টে আসার পর বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন আদালতে তুলে ধরেন তাঁর আইনজীবীরা। গত ৩১ জুলাই জামিন আবেদন খারিজ করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টে জামিন চেয়ে বিফল হয়ে গত ১৪ নভেম্ব^র আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন বেগম খালেদা জিয়া। এই জামিন আবেদনের শুনানিতে গত ২৮ নভেম্বর আপিল বিভাগ বিএসএমএমইউ হাসপাতালের প্রিজনস সেলে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়ার সর্বশেষ স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে জানাতে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে বোর্ডের মেডিকেল রিপোর্ট ৫ ডিসেম্ব^রের মধ্যে দাখিল করতে নির্দেশ দেন। সেদিন (৫ ডিসেম্ব^র) মেডিকেল প্রতিবেদন জমা না পড়ায় শুনানি পিছিয়ে ১২ ডিসেম্ব^র তারিখ ধার্য করেন আদালত।
যেভাবে কারাবন্দি খালেদা জিয়া : ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায় ঘোষণাকে ঘিরে ঢাকাসহ দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী গড়ে তোলে নিñিদ্র নিরাপত্তা। বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসা থেকে আদালত পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অগণিত সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিএনপি নেতাকর্মীরা যাতে কোনো ধরনের শোডাউন বা রাজপথে নামতে না পারেন, সেজন্য তারা ছিলেন তৎপর। তবে কোনো বাধাই আটকাতে পারেনি বিএনপির নেতাকর্মীদের। তারা সকাল থেকেই তাদের প্রিয় নেত্রীর জন্য অপোর প্রহর গুনছিলেন। দলের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত নিয়েই আদালতে যান বেগম খালেদা জিয়া। ওইদিন মামলার রায় শুনতে দুপুর পৌনে ১২টায় গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে আদালতের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে পথে পুলিশ আর র‌্যাবের বাধা ও সরকারি দলের লোকজনের সাথে সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই তাঁর গাড়িবহরে যোগ দেন হাজারো নেতাকর্মী। তাদের গগনবিদারী সেøাগানগুলোর মধ্যে ছিল- ‘আমার নেত্রী আমার মা-বন্দি হতে দেব না’, ‘জেল দিবি আমায় দে-দেশনেত্রীকে খালাস দে’। তাঁর গাড়িবহর গুলশান-১ হয়ে পুলিশ প্লাজা, হাতিরঝিল লিঙ্করোড হয়ে নাবিস্কো মোড়ে পৌঁছলে চার দিক থেকে গাড়িবহরে যোগ দিতে শুরু করেন ছাত্রদল ও যুবদলের শত শত নেতাকর্মী। বিএনপির বেশ কিছু কেন্দ্রীয় নেতাও ছুটে আসেন। গাড়িবহর তিব্বত, সাতরাস্তা দিয়ে এফডিসির মোড়ে পৌঁছলে শুরু হয় স্বতঃস্ফূর্ত গণজমায়েত। কাকরাইল এলাকায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষের পরও পুলিশি বাধা অতিক্রম করে নেতাকর্মীরা তাদের নেত্রীর নামে বিভিন্ন সেøাগান দিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর গাড়িবহর মৎস্য ভবন, প্রেসকাব, কদম ফোয়ারা, হাইকোর্ট মোড়, দোয়েল চত্বর, চানখাঁরপুল অতিক্রম করে বকশীবাজারের বিশেষ আদালতে পৌঁছায়। সেদিন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে ঘিরে উৎসুক মানুষের মনে দেখা দেয় কৌতূহল। সড়কের উভয় পাশে বিভিন্ন অফিস ও আবাসিক ভবনে থাকা লোকজন জানালা খুলে বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের দৃশ্য অবলোকন করেন। রাস্তায়ও নেমে আসেন সাধারণ মানুষ।




১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপিতে যোগ দেবার পর থেকে মোট পাঁচবার গ্রেফতার হন বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেফতার হন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে ওই বছরের ৩ সেপ্টেম্বর কারারুদ্ধ হন বিএনপি চেয়ারপারসন। পরে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান। সর্বশেষ জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি রয়েছেন তিনবারের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। এদিকে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন জেলার ২৩টি সংসদীয় আসন থেকে ভোট করে সব ক’টিতেই জয়লাভ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
বেগম খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে তাঁর আইনজীবীরা বলছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মোট ৩৬টি মামলা রয়েছে। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ৪টি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের গত দশ বছরে ৩২টি মামলা দায়ের হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এরমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ৫টি, নাশকতার ১৬টি, মানহানির ৪টি, ৩টি হত্যা, মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার ২টি, রাষ্ট্রদ্রোহের একটি, জন্মদিন পালনের একটি, সাবেক নৌমন্ত্রীর ওপর বোমা হামলার একটি, জাতীয় পতাকার অবমাননার একটি, ড্যান্ডি ডাইংয়ের অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন একটি এবং বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ের মালিকানা নিয়ে একটি দেওয়ানী মামলা রয়েছে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।










প্রথম পাতা'র আরও খবর
অনলাইন জরিপ

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেছেন, পাপুলদের অপকর্মের দায় সরকার এড়াতে পারে না। আপনি কি তাই মনে করেন?
 হ্যাঁ   না   মন্তব্য নেই
দিনকাল ই-পেপার
পুরনো সংখ্যা